শিরোনাম

ঢাকা, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : দেশের টেকসই উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠন এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞান ও গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার।
এ খাতে বর্তমানের ৩০ কোটি টাকার বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করার জন্য পরবর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে অর্থ বিভাগের সভাকক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ‘জাতীয় ও বৈশ্বিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে গবেষণা ও উন্নয়ন শক্তিশালীকরণ : সাশ্রয়ী ও উচ্চ প্রযুক্তিগত সমাধানের ব্যবহার’ শীর্ষক এই কর্মশালার উদ্বোধন করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ (কি-নোট) উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের ইমেরিটাস বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ফিরদৌসী কাদেরী, বিজ্ঞান গবেষক ড. আবেদ চৌধুরী এবং বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোবারক আহমদ খান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. সি আর আবরার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যখন বিজ্ঞান শিক্ষায় ভর্তি ও গবেষণা, উভয়ই উদ্বেগজনকভাবে কমছে। কোনো জাতির জন্য এটি মোটেও সুখকর নয়।’
তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে জিডিপির মাত্র ০.৩ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করছে, যা কেবল বৈশ্বিক মানদণ্ডেই নয়, অনেক স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায়ও কম।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম নিয়ে উপদেষ্টা বলেন, গবেষণায় সক্রিয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি ক্লিয়ারেন্স ও অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়ছে। অনেকক্ষেত্রে ৬ থেকে ৮ মাস সময় লেগে যাওয়ায় গবেষণার অর্থ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি সম্ভাবনাময় গবেষণাগুলো মাঝপথেই থমকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে গবেষণা ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য থাকা উচিত নয়। অবশ্যই জবাবদিহিতা থাকবে, তবে যেসব প্রতিষ্ঠান দায়িত্বশীলভাবে গবেষণা পরিচালনা করে, তাদের জন্য একটি ফাস্ট-ট্র্যাক সিস্টেম চালু করা জরুরি।’
এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জের বিষয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন ও স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রকে প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যয় বহন করতে হবে। তাই বিজ্ঞান, গবেষণা ও বিশেষায়িত ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’-এ বিনিয়োগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
এছাড়া তিনি অবকাঠামো খাতের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে কম বিনিয়োগের সমালোচনা করে বলেন, ‘অবকাঠামো খাতে সময়মতো অর্থ ব্যয় করতে না পারায় প্রতি বছর বিপুল টাকা ফেরত যাচ্ছে, যা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।’
প্রবাসী ও আন্তর্জাতিকভাবে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, জ্ঞান বিনিময় এবং দেশে ফিরে বা দূরবর্তীভাবে গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি শক্তিশালী রিসার্চ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বেসিক ও অ্যাপ্লাইড সাইন্সের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকবে। এর জন্য সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রাইভেট সেক্টরের মধ্যে সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ জরুরি।’
সি আর আবরার আরও বলেন, ‘গবেষণার ফলাফল শুধু প্রকাশনায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, সেগুলো বাস্তবসম্মত সমাধানে রূপ দিতে হবে। নলেজ-বেইজড ইকোনমি গড়ে তোলার এখনই সময়।’
শিক্ষা উপদেষ্টা গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, যুক্তিসংগত প্রত্যাশা এবং রিভিউয়ারদের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় আজ শুধু নীতিনির্ধারক নয়, গবেষণার একজন সক্রিয় অংশীদার হিসেবে কাজ করছে-এটাই আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি।’
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘সঠিক সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এই কর্মশালায় অংশ নেওয়াদের প্রতিভার শক্তিতেই আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।’
কর্মশালায় বিভিন্ন পর্যায়ের গবেষক, শিক্ষাবিদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।