শিরোনাম

ঢাকা, ২২ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, 'ভোট নিয়ে ষড়যন্ত্র থেমে নেই, সবাই সতর্ক থাকুন।'
তিনি বলেছেন, 'দেশি ও বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র এখনো চলছে। পত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে খবর এসেছে, প্রবাসীদের জন্য পাঠানো ব্যালট পেপার একটি দল দখল করেছে। আগামীতে ভোট বানচালের গভীর ষড়যন্ত্র হতে পারে। ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সবাই অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ থাকবেন।'
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কট্টাপাড়া মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় তিনি মঞ্চে ওঠেন। সিলেট থেকে শুরু করে একাধিক জনসভায় যোগ দিয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন।
তারেক রহমান বলেন, 'গত ১৫ বছরে তথাকথিত নির্বাচনের নামে যা হয়েছে, তাতে দেশের মানুষ প্রকৃত অর্থে ভোট দিতে পারেনি। শুধু ভোট দেওয়ার অধিকারই নয়, একই সঙ্গে মানুষের কথা বলার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।'
তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু একটি নিয়মিত নির্বাচন নয়, এটি গত ১৫ বছর ধরে কেড়ে নেওয়া জনগণের ভোটাধিকার ও কথা বলার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্বাচন। এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দেশের বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। এবার তাই যেকোনো মূল্যে ভোটের বৈতরণি পাড়ি দিতে হবে।
উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, সবাইকে সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। ফজরের নামাজ আদায় করে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে বাংলাদেশের মানুষ দেশকে স্বাধীন করেছিল। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সেই স্বাধীনতাকে আবার রক্ষা করেছে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কেউ কাউকে ধর্ম দিয়ে বিচার করেনি-কে মুসলমান, কে হিন্দু বা কে অন্য ধর্মের মানুষ, তা দেখা হয়নি।
ঠিক একইভাবে, তিনি বলেন, যখন ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে দেশের মানুষ আন্দোলনে নেমেছিল এবং ২০২৪ সালে রাজপথে নেমে এসেছিল, তখনও রিকশা চালক, ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস শ্রমিক, নারী-শিশু সবাই একসঙ্গে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। তখনও কেউ কারও ধর্ম-বর্ণ দেখেনি।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে হাজার বছর ধরে সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করে আসছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এবং অনেক ঘটনার বিচার হয়নি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দেশের মানুষ জীবন দিয়ে স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে। প্রায় হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন। এই ত্যাগকে অর্থবহ করতে হলে বাংলাদেশকে এমন একটি দেশে পরিণত করতে হবে, যেখানে সব ধর্মের মানুষ নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি আসনের মধ্যে ধানের শীষের চার প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি, আসন সমঝোতা হওয়া অন্য দুই দলের প্রার্থীর মার্কায়ও ভোট চান তারেক রহমান। তিনি 'ধানের শীষ' ‘খেজুর গাছ’ ও ‘মাথাল’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ধানের শীষের ভাই। আমাদের কঠিন সময়ে তারা পাশে ছিলেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবকে ভোট দিয়ে জয়ী করার আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, কেন ধানের শীষের পাশাপাশি তাদের জয়ী করতে হবে? কারণ এই মানুষগুলোর অবদান আছে। আজ যে ১৭ বছর পর ভোটাধিকার ও মানুষের কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তারা সেই আন্দোলনের অংশ ছিলেন। দেশের মানুষের পাশে ছিলেন। তাই বিএনপির, ধানের শীষের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের জয়ী করে আনা।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এ দেশটা কার? জনগণের দেশ। কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এই সমাবেশে আমার সামনে যে হাজার হাজার মানুষ বসে আছেন, আপনারাই এ দেশের মালিক। কাজেই আপনাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আপনারা কীভাবে দেশ পরিচালনা করতে চান। আর সেই সিদ্ধান্ত ভোটের মাধ্যমে নিতে হবে।
তিনি বলেন, একটি দল স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতা করে অসংখ্য মানুষ হত্যা করেছে। সেই একই দল এখন আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে তথাকথিত ‘বেহেশতের টিকিট’ বিক্রি করছে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে। আপনারা তাদের বয়কট করুন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সেদিন দলমত নির্বিশেষে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। তখনই স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের ভেতরের পাশাপাশি বিদেশেও ভোট নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ভোটারদের নিয়েও গভীর চক্রান্ত চলছে। সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
এলাকার উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উন্নয়ন ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিএনপির চারজন প্রার্থীকে ধানের শীষ প্রতীকে এবং শরিক দলের প্রার্থীদের খেজুর গাছ ও মাথাল মার্কায় ভোট দিতে হবে। তাহলেই এই এলাকার প্রকৃত উন্নয়ন হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তারেক রহমানের এই নির্বাচনী সমাবেশকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল যোগ দেয়। পুরো জেলা জুড়েই উৎসবের আমেজ বিরাজ করে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার খালেদ মাহবুব শ্যামলের সভাপতিত্বে এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় সভায় বক্তৃতা করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনের প্রার্থী মো. মুশফিকুর রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনের প্রার্থী জুনায়েদ সাকি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের আংশিক) আসনের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের প্রার্থী এম. এ. হান্নান।
সভায় জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও হাজারো সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।