শিরোনাম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : গবেষণার বৈশ্বিক মানদণ্ডে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। ২০২৫ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘স্কোপাস-ইনডেক্সড’ জার্নালে মোট ৬১৫টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে এক নতুন রেকর্ড গড়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক বছরে এত বিপুল সংখ্যক গবেষণা প্রকাশ এটিই প্রথম, যা চবির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গবেষণাবান্ধব নীতি এবং চবি রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার স্টাডি সোসাইটির (সিইউএইচআরএস) সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই সাফল্যের চিত্র উঠে এসেছে।
প্রকাশিত ৬১৫টি প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে রিসার্চ আর্টিকেল, রিভিউ আর্টিকেল, কনফারেন্স প্রসিডিংস এবং রিসোর্স অ্যানাউন্সমেন্ট। বিশেষ করে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’ এবং ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ প্রকাশিত হওয়া চবির গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিনটির অধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জন শিক্ষক শীর্ষ তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
এছাড়া, বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে রসায়ন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), ফার্মেসি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি এবং ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট গবেষণায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে।
অনুষদগুলোর মধ্যে এককভাবে সর্বাধিক এবং উচ্চমানের (কিউ১) গবেষণা প্রকাশ করে শীর্ষে রয়েছে জীববিজ্ঞান অনুষদ।
এছাড়া যৌথ গবেষণার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সৌদি আরব ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষকদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন চবির শিক্ষকরা। এ তালিকায় কেবল সেসব গবেষণা প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোতে ‘ইউনিভার্সিটি অফ চিটাগং’ এফিলিয়েশন উল্লেখ রয়েছে।
তবে এর বাইরেও ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য শিক্ষক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। প্রবন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ না থাকায় সেগুলো এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একাধিক উদ্যোগ হাতে নেয়। গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দপ্তর শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার ঘোষণা করে এবং চবির আইকিউএসি নিয়মিত গবেষণাধর্মী সভা, কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করছে। এসব গবেষণাবান্ধব কার্যক্রমের সমন্বিত ফল হিসেবেই এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও গবেষকরা।
গবেষণাভিত্তিক পরিবেশ ছড়িয়ে দিতে মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এ বছর থেকে নতুন বৃত্তি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর আওতায় থিসিস করা মাস্টার্স শিক্ষার্থীরা মাসিক ১০ হাজার, এমফিল শিক্ষার্থীরা ২০ হাজার এবং পিএইচডি গবেষকরা ৪০ হাজার টাকা করে বৃত্তি পাবেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গবেষণায় এই ধারাবাহিক অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অচিরেই আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক গবেষণামঞ্চে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। ২০২৫ সালের এই সাফল্য চবির গবেষণাভিত্তিক ভবিষ্যৎ যাত্রায় নতুন প্রত্যাশা যোগ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা গবেষণায় অনুদান বৃদ্ধি এবং নিয়োগ-পদোন্নতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জার্নালকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। গবেষণায় অনুদান বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি এবং গবেষকদের জন্য পুরস্কার ও সম্মাননা চালু করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইতিবাচক গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা হচ্ছে। ভালো মানের গবেষণায় যুক্ত শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্বেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, গবেষণায় পিছিয়ে থাকা কলা, মানববিদ্যা ও আইন অনুষদের জন্য আগামী বছর থেকে বিশেষ ট্রেনিং ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা হবে।
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় এই বিদ্যাপীঠটি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফতেপুরে ২৩শ একর পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। বর্তমানে এখানে ৯টি অনুষদ, ৪৮টি বিভাগ, ৬টি ইনস্টিটিউট এবং ৫টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ১৪টি হল (৯টি ছাত্র হল ও ৫টি ছাত্রী হল) ও ১টি হোস্টেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২৬ হাজার ৬৭৮ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন, যার মধ্যে ১৫ হাজার ৭৬৯ জন ছাত্র, ১০ হাজার ৯০৮ জন ছাত্রী এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী রয়েছেন। ১ হাজার ১০ জন শিক্ষক এবং প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে চলছে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।