শিরোনাম

চট্টগ্রাম, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন র্যাব কর্মকর্তা ও সদস্যরা। এ ঘটনায় আব্দুল মোতালে নামে চট্টগ্রাম র্যাবের একজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। র্যাবের কর্মকর্তা নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ।
নিহত আবদুল মোতালেব র্যাবের উপসহকারী পরিচালক। ডেপুটেশনে বিজিবি থেকে র্যাবে যোগ দিয়েছিলেন।
এ ঘটনায় আরো চারজন গুরুতর আহত হন। তাদেরকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বর্তমানে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র্যাবের অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্) সিরাজুল ইসলাম বলেন, সোমবার বিকেলে জঙ্গল সলিমপুরে চট্টগ্রাম র্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের থেকে একটি টিম আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে।
এ সময় র্যাবের চার কর্মকর্তা ও সদস্য এবং এক সোর্সকে আটকে বেদম প্রহার করে দুর্বৃত্তরা। পরবর্তী সময়ে পুলিশ ও র্যাবের অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিম্মিদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে। সেখানে আবদুল মোতালেবকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিম্মি থাকা কর্মকর্তা ও সদস্যদের উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে র্যাবের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনার সময় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন র্যাব সদস্যরা। এতে চারজন গুরুতর আহত হন। এর মধ্যে একজন র্যাব সদস্য নিহত হন চিকিৎসাধীন অবস্থায়। বাকি তিনজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
জানা গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি এখনো সশস্ত্র পাহারায় নিয়ন্ত্রিত হয় এবং বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ।
জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। জেলা প্রশাসন সূত্র অনুযায়ী, লিংক রোড সংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাস জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলে আসছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র-সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। এর জেরে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যার সবগুলো পাহাড় দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। সবশেষ ওই এলাকায় দুটি পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় একজন নিহত হন। এর পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
এর আগে একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ ও পাহাড় কাটা বন্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার মুখে পড়ে প্রশাসন। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, থানার ওসি ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও একাধিকবার র্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম খবর পেয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি খাস জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও জমি উদ্ধার না হওয়ায় কোনো প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি।