শিরোনাম

মো. আয়নাল হক
রাজশাহী, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): গ্রাম থেকে আম কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতেন বাবা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে ছেলে মুরাদ পারভেজও সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। শুরু করেন আমের ব্যবসা। তবে বাবার মতো ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতে হয়নি তাকে। বরং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্ডার নিয়ে ক্রেতাদের দোরগোড়ায় আম পৌঁছে দিচ্ছেন।
একসময় আশপাশের লোকজনও তাচ্ছিল্যের সুরে বলত, ‘বাপ আম বেচত। ব্যাটাও তাই শুরু করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও চাকরি পেল না।’
তবে এসব কথা কানে তোলেননি মুরাদ। ফেসবুকে পেইজ খুলে তিনি আমের অর্ডার নেওয়া শুরু করেন। প্রথম বছরেই মেলে সাড়া। এরপর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মুরাদের। শীতের মৌসুমে শুরু করেন খাঁটি খেজুর গুড় বিক্রি।
মুরাদ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাদ্য প্রযুক্তি ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক পাস করেছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি বিষয়ে অর্জন করেছেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। সবসময়ই তার লক্ষ্য ছিল মানুষকে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা। এই নীতিই মূলত তাকে সফল উদ্যোক্তা বানিয়েছে।
মুরাদ পারভেজের বাড়ি রাজশাহীর পবার পাইকপাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম মুন্তাজ আলী।
২০২০ সালে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে হাতেখড়ি নেওয়া মুরাদ এখন জেলার অন্যতম বড় উদ্যোক্তা। তিনি কখনও চাকরির পেছনে ছোটেননি। বরং এখন নিজের প্রতিষ্ঠানেই ৩৫ জনের সরাসরি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।
মুরাদের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের নাম ‘ম্যাঙ্গো লাভার’। এর মাধ্যমে তিনি আমের পাশাপাশি খেজুরের গুড় ও লিচুও বিক্রি করেন। পবার বজরাপুর, কাঁঠালবাড়ি এবং দুর্গাপুরের আমগাছি গ্রামের গাছিরা মুরাদকে খাঁটি খেজুর গুড় সরবরাহ করেন।
রস ছাড়া শুধু রাসায়নিক দিয়ে খেজুর গুড় তৈরি কিংবা গুড়ে চিনির মিশ্রণ দেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি রাজশাহীর গুড়ের দুর্নাম বেড়েছে। ঠিক সেই সময় বজরাপুর গ্রামের ৪১ জন, কাঁঠালবাড়ি গ্রামের ১৭ জন এবং আমগাছি গ্রামের ৪৮ জন গাছি খাঁটি গুড় তৈরি করছেন মুরাদের ক্রেতাদের জন্য। এই গুড় ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে এবং গাছিরাও ন্যায্য পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।
এই পুষ্টিবিদ এখন প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার কেজি খাঁটি গুড় ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উদ্যোক্তা মুরাদ পারভেজ বলেন, দৈনিক কমপক্ষে ১৩শ’ ক্রেতার জন্য আড়াই থেকে তিন হাজার কেজি গুড় পার্সেল করতে হয়। এই কাজের সঙ্গে সরাসরি ৩৫ জন লোক জড়িত। এছাড়া প্রায় ছয় হাজার খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে অন্তত ৮০ জন গাছি পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।
মুরাদের ‘ম্যাঙ্গো লাভার’-এ প্রতি কেজি পাটালি গুড় ও লালি গুড় বিক্রি হয় ৩৯০ টাকায়। আর বীজ গুড় বা চকলেট গুড় বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৪৯০ টাকায়।
জানা যায়, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে খাঁটি খেজুর গুড়ের অর্ডার দিয়ে ক্রেতারা ভেজাল গুড় পেয়েছেন-জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রায়ই এমন অভিযোগ করা হয়। সেজন্য দপ্তরের কর্মকর্তারা নিয়মিত গুড় তৈরির কার্যক্রম মনিটরিং করছেন। বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ইব্রাহিম হোসেন উদ্যোক্তা মুরাদকে গুড় সরবরাহকারী গাছিদের বাড়ি বাড়ি যান। তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।
এদিকে, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম, স্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা এবং নারীর ক্ষমতায়নে উদ্যোগ গ্রহণের ফলে রাজশাহীতে ই-কমার্স উদ্যোক্তা কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বিশেষায়িত আইটি সংস্থা ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ সেমিনার এ খাতে বড় ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বাণিজ্য এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক পণ্য বিক্রির মাধ্যমে উদ্যোক্তারা সফলতার মুখ দেখছেন।
বছর দশেক আগে মাত্র ৫শ’ টাকার বিনিয়োগে মিলেটের গুঁড়া ও বার্লি আটা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা নিপা সেনগুপ্তা (২৩)।
শুরুতেই তার বার্লি পণ্য ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। কারণ এটির পুষ্টি ও খাদ্যমান ছিল অন্যান্য খাদ্যশস্যের তুলনায় বেশি। জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকায় তিনি বার্লি, গম, চাল, ডাল ও ছোলার মিশ্রিত গুঁড়া পণ্যও তালিকায় যুক্ত করেন।
গ্রাহকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়ার পর তিনি ভেজালমুক্ত আখের গুড়, মাখন, গমের আটা, ঢেকিঁছাটা চাল এবং মৌসুমি ফলের আচারও বিক্রি করা শুরু করেন।
নিপা বলেন, কখনো ভাবিনি জীবনে আয়-রোজগার করতে পারব। এখন মাসে এক লাখ টাকারও বেশি পণ্য বিক্রি করি।
ই-বিজনেস নারীর নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলতে জোরালো ভূমিকা রাখছে। এটি নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রান্তিক পর্যায়ের দুই নারী বর্তমানে নিপার ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন। এখান থেকে উপার্জনের টাকা দিয়ে তারা নিজেদের পরিবারকে সহায়তা করছেন।