বাসস
  ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:২২

বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল : দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল

মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ। ফাইল ছবি

ঢাকা, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : বিগত পনের বছরে দেশের বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ১নং এজলাস কক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতিকে দেওয়া সংবর্ধনায় তিনি এ কথা বলেন।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বলেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সর্বশেষ ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল আদালত। কিন্তু বিগত স্বৈরশাসনের সময়ে সেখানে নির্যাতিত অসহায় মানুষের ঠাঁই হয়নি। তখন সুবিচারের পরিবর্তে অবিচারই প্রাধান্য পেয়েছিল। 

তিনি আরও বলেন, বিগত পনের বছরে বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করা হয়েছিল। বিচার বিভাগ অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন হাতিয়ার। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। 

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বলেন, তখন বিচারপ্রার্থী, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের আহাজারি আদালতের মনে আঁচর কাটতে পারেনি। ফলে বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে। নারী, পুরুষ ও শিশুদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিচার বিভাগ সেই অত্যাচারিত মানুষের পাশে ন্যায়ের ঝান্ডা নিয়ে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতা আমাদের সকলের। তখন বিচার বিভাগের রন্দ্রে রন্দ্রে দুর্নীতির সয়লাব বয়ে গিয়েছিল। 

তিনি আরও বলেন, সেই সময়ে বিচারের কারণ-বিহীন দীর্ঘসূত্রিতা ও উদ্দেশ্যমূলক অতি দ্রুত বিচার দু’টোই বিচার বিভাগকে আশংকায় ফেলে দিয়েছিল। বিচার বিভাগ তার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে বিচার বিভাগ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশার কবর রচিত হয়েছিল।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সফল বিপ্লবের পর এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। বিচার বিভাগ তার হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরে পায়। সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সুদৃঢ় ও ঐকান্তিক উদ্যোগে ও প্রাক্তণ অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সহযোগিতায় এবং বর্তমান সরকারের সদিচ্ছায়, ‘মাসদার হোসেন মামলা’র রায়ের নির্দেশনার আলোকে অতি সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত হয় একটি ‘স্বাধীন সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয়’।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বলেন, বিচার বিভাগের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হল দুর্নীতি। দুর্নীতির এই বিষবাষ্প বিচারকার্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আক্রান্ত করেছে। 

তিনি বলেন, জাতি প্রত্যাশা করে, বিচার বিভাগ সিন্ডিকেট মুক্ত হোক, দুর্নীতিমুক্ত হোক। দুর্নীতির প্রচলিত ধারণায় অর্থনৈতিক লেনদেনকে বুঝালেও, বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি ডিনামাইটের চেয়েও ধ্বংসাত্মক, অ্যাটম বোমার চেয়েও ভয়াবহ, ক্যানসারের চেয়েও মরণঘাতী। সুতরাং শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের সকল স্তর থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। আর রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের নিরীক্ষক বিচার বিভাগ। যখন অন্য দুই অঙ্গ এড়িয়ে যায়, ভুল করে, অন্যায় বা অবৈধ কোন কিছু করে, তখন বিচার বিভাগ সাড়া দেয়, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করে।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীকে দেওয়া আজকের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতি, সিনিয়র আইনজীবী, সাংবাদিক ও সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ১৯৬১ সালের ১৮ মে বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। 

তার পিতা প্রয়াত বিচারপতি এ এফ এম আবদুর রহমান চৌধুরী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ছিলেন এবং মাতা বেগম সিতারা চৌধুরী ছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ১৯৭৯ সালে নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে এলএল.বি (অনার্স) ও এলএলএম ডিগ্রী অর্জন করে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হাল-এ মানবাধিকার বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আইনে এলএলএম ডিগ্রী অর্জন করেন।

১৯৮৫ সালের ৩ মার্চ জুবায়ের রহমান চৌধুরী বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত আইনজীবী হয়ে ঢাকা জেলা জজ আদালতে আইন পেশা শুরু করেন। 

১৯৮৭ সালের ১৭ মে তিনি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসাবে তালিকাভুক্ত হন।

২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হন জুবায়ের রহমান চৌধুরী। 

দুই বছর পর ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট তিনি হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসাবে শপথ গ্রহন করেন। 

গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতি হন। 

গত ২৮ ডিসেম্বর দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।