শিরোনাম

সংসদ ভবন, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বাসস): জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান বলেছেন, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সৎ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। একইসঙ্গে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বন্ধ, ফেলানী হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ এবং তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধান চান তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী দিনে আজ দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক চায়, বাংলাদেশও একইভাবে সৎ প্রতিবেশী হতে চায়। এ ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই নিজেদের সদিচ্ছা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।
তিস্তা নদীর পানিবণ্টন প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর পানি নিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। তিস্তা সমস্যার সমাধান না হলে উত্তরবঙ্গের মানুষের কষ্ট দূর হবে না। তিনি দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই সমস্যার একটি ন্যায়সংগত ও টেকসই সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তব্যে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামল, রাজনৈতিক সংঘাত, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অতীতের ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে জনগণের মতামত, ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত থাকবে।
তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে শুধু দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং জনগণের অভিজ্ঞতা ও অধিকারকে সামনে রেখে মূল্যায়ন করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়, বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামরিক শাসন, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন, পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
বক্তব্যে তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের কথাও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ওই আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো দল বা ব্যক্তি যেন রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে না পারে, সেদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সতর্ক থাকতে হবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক শান্তি ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সঙ্গে কোনো বৈরী সম্পর্ক চায় না। বাংলাদেশ চায় পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক।
একইসঙ্গে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের অর্থ একতরফাভাবে কোনো পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা নয়। বরং উভয় দেশের জনগণের স্বার্থ, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক পরিচালনা করাই প্রকৃত বন্ধুত্বের ভিত্তি হতে পারে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অধিকার, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনের জবাবদিহি, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, জ্বালানি, শিল্প ও প্রবাসী কর্মসংস্থানসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, যেখানে কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা দল রাষ্ট্রের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে না। জনগণের ভোট, মতামত ও অধিকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতের ভুল-ত্রুটি নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ানোর পরিবর্তে ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও স্থিতিশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও জনগণকেন্দ্রিক হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক মত দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের শাসনামলে দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা ও অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
অতীতের রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার ও সত্য উদঘাটনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।