বাসস
  ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৫৬

পাহাড়ি-বাঙালির সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হওয়ার অপেক্ষায় খাগড়াছড়িবাসী

।। জীতেন বড়ুয়া।।

খাগড়াছড়ি, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বাসস): পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার আশা দীর্ঘ দিনের। এই আশাকে কখনো ভোটের মাঠের প্রতিশ্রুতিতে, কখনওবা নির্বাচিত সরকারের টিকে থাকার বিশেষ কৌশল হিসেবে দেখানো হয়েছে। 

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনকে ঘিরে পাহাড় বাসীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা দিন গুনছেন নির্বাচনি ফলাফলের। নতুন সরকারের। যারাই রাষ্ট্র ক্ষমতাই আসুক না কেন তাদের প্রত্যাশা স্থানীয় জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানসহ একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। 

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সংসদীয় এ আসনটিতে ভোট মানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং স্থিতিশীল ভবিষ্যতের আশা। জেলার উন্নয়নে যারা কাজ করবেন, এমন প্রার্থীকেই ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাতে চান ভোটাররা। 

খাগড়াছড়ি জেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম জেলা, পূর্বে রাঙামাটি জেলা এবং ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন আসনের মধ্যে খাগড়াছড়ি আসনটি ভৌগোলিক, জাতিগত, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত কারণে বরাবরই আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকে। ২ লাখ ৬৯ হাজার ৯ শত ৫৬ বর্গ কি.মি আয়তনের খাগড়াছড়ি ২৯৮ নং আসনে পাহাড়ি ও বাঙালি মিলে প্রায় ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৬ শত ৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭৬ হাজার ১৩ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭১ জন। তৃতীয় লিঙ্গ- ৪ জন। এই ভোটারের মধ্যে নতুন ভোটারের সংখ্যা- ২৭ হাজার। এই কেন্দ্রে মোট ভোট কেন্দ্র ২০৩ টি। যার মধ্যে ২ উপজেলায় হেলিস টিং কেন্দ্র রয়েছে ৩ টি। ( অতি দুর্গমতার কারণে এসব কেন্দ্রে নির্বাচনি সরঞ্জাম ও জনবল হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বহন করতে হয়। তাই এসব কেন্দ্রকে হেলিস টিং কেন্দ্র বলা হয়।)। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের নিয়ে ভোটারদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা কল্পনা। খাগড়াছড়ি জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে ২৯৮ নং সংসদীয় আসন। এ আসনে বিভিন্ন দলের ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)র আব্দুল ওয়াদুদ ভুইঁয়া, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অ্যাডভোকেট ইয়াকুব আলী চৌধুরী, ইসলামি আন্দোলনের মো. কাউছার, জাতীয় পার্টির মিথিলা রওয়াজা, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি)র উশোপ্রু মারমা, গণ অধিকার পরিষদের দীনময় রওয়াজা, ইনসানিয়াত বিপ্লব-এর মো. নূর ইসলাম, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. মোস্তফা, স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান, জিরুনা ত্রিপুরা এবং ধর্ম জ্যোতি চাকমা। 

নির্বাচন নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যেও রয়েছে নানা পরিকল্পনা। পাহাড় বাসীদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজনের ওপর আলোকপাত করে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যেই ভবিষ্যতের স্বস্তি পেতে চান পাহাড়ি জনগণ। 

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাসসের সাথে কথা হয় এই আসনের তিন হেভিওয়েট প্রার্থীর সাথে। তারা হলেন, বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী এবং মাইনরিটি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক উশেপ্রু মারমা।

আব্দুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া দীর্ঘ ৫০ বছর বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান। বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহ কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক ও খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে নিয়োজিত আছেন। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। স্বাভাবিকভাবেই তার কাছে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিস্তর সুযোগ রয়েছে।  

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী জেলার মাটিরাংগা উপজেলার তাইন্দং এলাকার আচালং তাহের সদ্দার পাড়ার বাসিন্দা। একাধারে রাজনীতিবিদ এবং সমাজসেবক এয়াকুব আলী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সামাজিক সুস্থিতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। খাগড়াছড়ি মেডিক্যাল সেন্টারের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন।

বিএমজেপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক উশেপ্রু মারমা পেশায় একজন কৃষক এবং তরুণ রাজনীতিবীদ। জেলার গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের নতুন পাড়া গ্রামে ১৯৮২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাশ করে নিজ এলাকার উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতির সাথে ও তার ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। তিনি হাফছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গুইমারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাহাড়ের তৃণমূলের জনগণের সাথে তার যে প্রাণের বন্ধন তাও এলাকাবাসীর কাছে বিবেচনার দাবি রাখে।  

এই তিনজন প্রার্থীই খাগড়াছড়ির জনগণের দীর্ঘদিনের সুখ-দু : খের সাথি। কাজেই তাদের মধ্যে যিনিই নির্বাচিত হোন না কেন, জনগণের আশা পূরণ হলেই তারা খুশি। প্রার্থীরাও জনগণের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে ভোটের আগেই উন্নয়নের নানা ছক কষছেন। 

অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন নগরী খাগড়াছড়ির উন্নয়নে সবাই পর্যটন খাতকে উন্নত করার পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ব্যাপারে আশাবাদী। তারা মনে করেন, খাগড়াছড়িবাসীর প্রকৃত উন্নয়ন করতে হলে তাদের টেকসই কর্মসংস্থান, সুস্বাস্থ্য, সুচিকিৎসা এবং উন্নত শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সেই ভাবনা মাথায় রেখেই তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছেন।  

আগামীর বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মকে সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশ উপহার দেওয়ার জন্য এলাকায় শিল্পায়নকে তারা অন্যতম জরুরি কর্তব্য বলে মনে করেন। তবে সবার আগে পাহাড়ি-বাঙালির সম্পর্ক সুদৃঢ়করণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় জনগণের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন যত দৃঢ় হবে, এলাকার উন্নয়নও তত ত্বরান্বিত হবে।   

জেলায় হামলা, মামলা, মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলেও জনগণের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। কাজেই যে প্রার্থীই নির্বাচিত হয়ে আসুন না কেন, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জনগণের কল্যাণে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক সুবিচার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ তাকে নিতেই হবে। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনের মাঠে সব দলের প্রার্থীই নিজেকে সেরা হিসেবে উপস্থাপন করার পাশাপাশি নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আশ্বস্ত করতে চাইছেন। 

এদিকে নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্বাচনি আচরণবিধি মানার ব্যাপারে প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। তারা মনে করছেন, যারা নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করবে তারা হয়ত জনপ্রিয়তা হারাবে। এ কারণে দলগুলো তাদের নিজেদের মধ্যে আচরণবিধি মানার ব্যাপারে এক ধরনের মৌন প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। এতে অবশ্য নির্বাচন কমিশনের কাজ অনেকটাই সহজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। 

এই নির্বাচনের একটি বড় দিক হলো : গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। এসব দলের প্রার্থীরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে তাদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে সাধারণ জনগণ তেমন কিছু না জানলেও দীর্ঘ অনিয়ম-অনাচারের সংস্কারের প্রশ্নে তারাও একমত। তাই প্রার্থীদের মতামত ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। 

এদিকে প্রার্থীদের প্রতি যেমন জাতীয় নির্বাচন কমিশন কঠোরভাবে নির্বাচনি আচরণবিধি মানার তাগিদ দিচ্ছেন, অন্যদিকে প্রার্থীদেরও প্রত্যাশা একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। নাহলে জুলাই আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলা স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।