শিরোনাম

নওগাঁ, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আর মাত্র তিন দিন। নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের ব্যস্ততা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে প্রচার-প্রচারণা, মতবিনিময় ও উঠান বৈঠক। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে নওগাঁ জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের ২৭জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৫ জন। এই ৩২ জন প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের মাধ্যমে। ৬টি আসনে মোট ২৩ লাখ ২৯ হাজার ৫৯২ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এরমধ্যে সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ৬৩ হাজার। কাজেই নৌকাবিহীন এবারের ফলাফল নির্ধারণ হবে ওই সকল সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারদের ভোটের মাধ্যমে। তাই কোন কোন প্রার্থী হাসবে বিজয়ের হাসি, পড়বে জয়ের মালা তা বলা মুশকিল।
এক সময়ের বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত উত্তরের এই জেলায় এবার প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে মূলত বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে। আওয়ামীলীগবিহীন নির্বাচনে এই দু’টি দলের প্রচারণা চলছে জোরে শোরে। তবে তিনটি আসনে রয়েছে বিএনপি’র স্বতন্ত্র প্রার্থী। ইতোমধ্যে দুইজনকে বহিস্কার করা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলে বহিস্কার করা হচ্ছে কর্মীদের। তবে জামায়াতে ইসলামী এবার প্রচার-প্রচারণায় সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছেন। পাচ্ছেন সমর্থন, বাড়ছে ভোট। বসে নেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। তাদেরও প্রচার-প্রচারণা দেখার মতো। সমর্থন ও ভোট বাড়ানোর চেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছেন। কাজেই বিএনপি কি আসনগুলো পুনরুদ্ধার করতে পারবে? এমনই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় আছেন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কর্মী সমর্থকরা।
যার কারণে নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন রাজনৈতিক দলগুলো। দিচ্ছেন নিজ নিজ দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নানা প্রতিশ্রুতি। উদ্দেশ্য এলাকায় দলের প্রতীককে জয়ী করা। তবে এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের গেম চেঞ্জার হতে পারেন সংখ্যালঘু ভোটাররা। তারা হতে পারে এই নির্বাচনে ‘ট্রাম্পকার্ড’। কারণ, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোট জয়-পরাজয়ে বড় ফ্যাক্টর হবে বলে অনেকেই মনে করছেন। এছাড়া বিগত দিনে এই ৬টি আসনে আওয়ামীলীগকে ভোট দেওয়া ভোটাররাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কাজেই তারাই অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে নওগাঁ জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারেন। সেই সাথে মোট ভোটারদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারী ভোটার। নির্বাচনে এই ভোট গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে এর সঙ্গে নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিশেষ গরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। এখন সংখ্যালঘু ও নারী ভোটারদের উপস্থিতি অনেকটা নির্ভর করবে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরে। গোলমালের আশঙ্কা থাকলে তারা অনেকেই হয়তো নাও যেতে পারেন। হেনস্তা হতে চান না কেউ। ভোটের দিন পরিস্থিতি কেমন হয়, সেটি নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। ভোটার উপস্থিতিতেও নিরাপত্তার ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে দেখা হচ্ছে।
এরই মধ্যে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনি প্রচারে ভোট কেন্দ্র পাহারা দেয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সকালে গিয়ে ভোট কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এখন দুই দলেরই কর্মীরা ভোট কেন্দ্র পাহারা দিবে বা দেয়ার চেষ্টা করবে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের আশা ও প্রত্যাশা ‘আমরা একটা সুরক্ষিত বাংলাদেশ চাই। সবার জন্য ভাল হবে এমন পরিবেশ চাই। যে দলই ক্ষমতায় আসুক-আমাদের অধিকার যাতে পুরণ হয়।’ ‘নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য এবং দেশের সংস্কার। এছাড়া আমাদের বাক স্বাধীনতা যাতে ঠিক থাকে-এটাই আমরা চাই। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা উন্নয়ন ও সুশাসনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। দীর্ঘদিনের বন্যা ও জলাবদ্ধতার সমস্যা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থান এসব বিষয় এবার ভোটারদের প্রধান প্রত্যাশা।
আসন ভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী প্রার্থীরা: নওগাঁ-১ (নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার) আসনের প্রার্থীরা হলেন, বিএনপি’র প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম (দাঁড়ি পাল্লা), ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল হক শাহ (হাতপাখা) ও জাতীয় পার্টির আকবর আলী (লাঙ্গল) এবং বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ডা. ছালেক চৌধুরীর প্রতীক (মোটরসাইকেল)। এই আসনে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫ জন ভোটার ১৬৬টি কেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭৭ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৪ এবং হিজড়া ৪জন। ছালেক চৌধুরী হেভিওয়েট প্রার্থী হওয়ায় এখানে ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে অনেকে বলছেন। কাজেই এখানে ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূূর্ণ ভূমিকা রাখবে প্রায় ৯০ হাজার সংখ্যালঘু ভোটার।
নওগাঁ-২ (পত্নীতলা ও ধামইরহাট) আসনের বিএনপি’র প্রার্থী সামসুজ্জোহা খান (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর এনামুল হক (দাঁড়ি পাল্লা) ও এবি পার্টির মতিবুল ইসলাম (ঈগল) প্রতীক। এই আসনে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৪৩৬ জন ভোটার ১২৪টি কেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩৭৫ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯ জন এবং হিজড়া ২জন এবং মোট ভোটারের মধ্যে দুই উপজেলায় মোট সংখ্যালঘু ভোটার আছে প্রায় ৪৫ হাজার। ফলাফলে গুরুত্বপূূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে তারা। নওগাঁ-৩ (মহাদেবপুর-বদলগাছী) আসনের বিএনপি’র প্রার্থী ফজলে হুদা বাবুল (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মাহফুজুর রহমান (দাঁড়ি পাল্লা), জাতীয় পার্টির মাসুদ রানা (লাঙ্গল), বাসদের কালিপদ সরকার (মই), বিএনএফ’র আব্দুল্লাহ আল মামুন সৈকত (টেলিভিশন) এবং ইসলামী আন্দোলনের নাসির বিন আসগর (হাত পাখা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি (কলস) ও আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদ্দাম হোসেন (জাহাজ) প্রতীক। এই আসনে ১৪২টি কেন্দ্রে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৮৫ জন ভোটার ভোট প্রদান করবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৮ হাজার ৯৮৮ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ২১ হাজার ৭৯৬ জন এবং হিজড়া ১জন। এখানে পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি ও সাদ্দাম হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় এখানেও প্রায় ৮৫ হাজার সংখ্যালঘু ভোটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নিধারণ করবে সংখ্যালঘু ভোটাররা।
নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের প্রার্থীরা হলেন, ইকরামুল বারী টিপু (বিএনপি), আব্দুর রাকিব (জামায়াত), জাতীয় পার্টির আলতাফ হোসেন (লাঙ্গল) প্রতীক, ইসলামী আন্দোলনের সোহরাব হোসাইন (হাতপাখা) ও সিপিবি’র ডা. এস এম ফজলুর রহমান (কাস্তে) প্রতীক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আরফানা বেগম (কলস) প্রতীক। এই আসনে ১১৭টি কেন্দ্রে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬০ জন ভোটার ভোট দিবেন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৩ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৬৮ হাজার ২১৩ জন এবং হিজড়া ৪ জন। এখানে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কাজেই এখানেও প্রায় ৪৫ হাজার সংখ্যালঘু ভোটার ট্রামকার্ড হতে পারে।
নওগাঁ-৫ (সদর) আসনের প্রার্থীরা হলেন, জাহিদুল ইসলাম ধলু (বিএনপি), আবু সাদাত মো. সায়েম (জামায়াত), সিপিবির শফিকুল ইসলাম (কাস্তে), ইসলামী আন্দোলনের আব্দুর রহমান (হাতপাখা) এবং জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন (লাঙ্গল) প্রতীক। এই আসনে ১১৮টি কেন্দ্রে মোট ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩০জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রদান করবেন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮০ হাজার ৩১ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৯৪ এবং হিজড়া ৫জন। এখানে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কাজেই এখানেও প্রায় ৩৮হাজার সংখ্যালঘু ভোটার ট্রামকার্ড হতে পারে।
সর্বশেষ নওগাঁ-৬ (রাণীনগর ও আত্রাই) আসনের প্রার্থীরা হলেন, বিএনপি’র, শেখ রেজাউল ইসলাম রেজু (ধানের শীষ) জামায়াতে ইসলামীর খবিরুল ইসলাম (দাঁড়ি পাল্লা), ইসলামী আন্দোলনের রফিকুল ইসলাম (হাত পাখা) এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির আতিকুর রহমান রতন মোল্লা (হাতি) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আলমগীর কবির (মোটরসাইকেল) প্রতীক। মোট ভোটার ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৪১৬ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৫০ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১ এবং হিজড়া ৫ জন। কেন্দ্র ১১৫টি। এই আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ত্রিমুখী। কাজেই এখানেও প্রায় ৬০ হাজার সংখ্যালঘু ভোটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রাখবে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম মুঠোফোনে বাসস’কে বলেন, মানুষ এবার উৎসবমূখর পরিবেশেই নির্বাচন করবে। এজন্য সারা জেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে চেকপোস্ট বসিয়েছি, মানুষকে আশ্বস্ত করছি যে, নির্বাচনে কোনো ধরণের শঙ্কা নেই। মূলত সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সতর্ক অবস্থানে থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল সাইলাম বাসস’কে বলেন, আনন্দ ও উৎসবমূখর পরিবেশে নির্বাচন করতে আমরা বদ্ধ পরিকর। ভোটারদের উৎসাহ দিতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বর্তমানে নির্বাচনি মাঠে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছে। এছাড়াও প্রত্যেক এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করবে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি নির্বাচনি মাঠে কাজ করবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠ, সুন্দর, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
উল্লেখ, ৬টি আসনে ৭৮২টি কেন্দ্রে মোট ২৩ লাখ ২৯ হাজার ৫৯২ জন ভোটার ভোট প্রদান করবেন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬৪ জন ও নারী ভোটার ১১ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৭ জন এবং হিজড়া ২১ জন। এই ছয়টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটার আছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার। যা মোট ভোটারের ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ।