শিরোনাম

খাগড়াছড়ি, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের ২০৩ কেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টিই ঝুঁকিপূর্ণ এবং এরমধ্যে ৬৮টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে জেলা পুলিশ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে তালিকা প্রেরণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের সীমান্ত জনপদ নাড়াইছড়ি এবং লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নের ফুত্যাছড়ি ও শুকনাছড়ি কেন্দ্রে ভোটের সামগ্রী আর জনবল যাবে হেলিকপ্টারে।
এ ছাড়া সবকটি কেন্দ্রকে দূরত্ব, ভোটারদের অবস্থান, প্রার্থীদের প্রভাব, যোগাযোগ এবং আইন-শৃঙ্খলাগত চিন্তা থেকে তিন ক্যাটাগরিতে বিশেষায়িত করা হয়েছে।
এরমধ্যে সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে মাত্র ১৪টি কেন্দ্র। ১২১টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬৮টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের তালিকায় দেখা গেছে, ২০৩টির কেন্দ্রের মধ্যে ৬৮টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৬টি কেন্দ্র খাগড়াছড়ি সদর উপজেলাতেই। এরপর রামগড়ে ১১টি, গুইমারায় ১০টি, মানিকছড়িতে নয়টি, মহালছড়িতে আটটি, মাটিরাঙায় পাঁচটি, দীঘিনালায় চারটি, পানছড়িতে তিনটি এবং লক্ষ্মীছড়িতে দু’টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের মোট ভোটারের সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। তারমধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৮০ হাজার ২০৬ জন এবং নারী ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০৪ জন। এরমধ্যে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৬৮টি কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা হলো- ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬২৬ জন।
উপজেলা অনুযায়ী দেখা গেছে, সদর উপজেলার ১৬ কেন্দ্রে ৪০ হাজার ৪৮৬ জন, রামগড় উপজেলার ১১ কেন্দ্রে ২৭ হাজার ৭৩১ জন, গুইমারা উপজেলার ১০ কেন্দ্রে ২৭ হাজার ২৬৪ জন, মানিকছড়ি উপজেলার ৯ কেন্দ্রে ২৩ হাজার ৩৮২ জন, মহালছড়ি উপজেলার ৮ কেন্দ্রে ২০ হাজার ৫৩৪ জন, মাটিরাঙা উপজেলার পাঁচ কেন্দ্রে ১৩ হাজার ৬৯৯ জন, দীঘিনালা উপজেলার চার কেন্দ্রে ১১ হাজার ১৮ জন, পানছড়ি উপজেলার তিন কেন্দ্রে ৬ হাজার ৬৫৩ জন এবং লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার দুই কেন্দ্রে ২ হাজার ২৩৮ জন।
দীঘিনালা উপজেলার চারটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে বাবুছড়াতেই তিনটি রয়েছে। এই ইউনিয়নের নুনছড়ি কেন্দ্রের ভোটার অলকেশ চাকমা। তিনি ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা থেকে জানান, খাগড়াছড়ির মধ্যে সমতল এলাকাগুলোতে তুলনামূলকভাবে ভোটকেন্দ্র বেশি। আর পাহাড়বেষ্টিত এলাকার বাসিন্দারা বসবাস করেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে। জীবন ও জীবিকার এই বাস্তবতা নির্বাচন কমিশন কখনো ভেবে দেখেনি। এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গগন বিকাশ চাকমাও একই ধরনের মত ব্যক্ত করেছেন।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া, পেরাছড়া এবং খাগড়াছড়ি ইউনিয়নের সবক’টি ভোট কেন্দ্রই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
এই তিন ইউনিয়নের ১০ জন ভোটারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গোলাবাড়ি ইউনিয়নে মাত্র তিনটি ভোটকেন্দ্র্র। ভোট দিতে যেতে আসতেই দিন শেষে সন্ধ্যা নামে। অথচ এই ইউনিয়নে কমপক্ষে আরো তিনটি ভোট কেন্দ্র করা গেলে ভোটারদের জন্য সুবিধা হতো।
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নটি সড়ক যোগাযোগের দিক থেকে উপজেলা সদরের সাথে বিচ্ছিন্নই বলা চলে। এই ইউনিয়নের বাসিন্দারা ফটিকছড়ির খিরাম-নানুপুর-নাজিরহাট-বিবিরহাট হয়েই আসা-যাওয়া করেন। এই ইউনিয়নের ভোটার সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান নির্মল কান্তি চাকমা। তিনি জানান, এখানে অনেক বাসিন্দাকে একদিন আগেই ভোট কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। না হয় দিনে এসে দিনে ভোট দেয়া প্রায় অসম্ভব। অনেক বয়স্ক-প্রতিবন্ধী এবং অসুস্থ ভোটাররা ইচ্ছে থাকা সত্বেও ভোট দিতে পারেন না।
মাটিরাঙা উপজেলার মাটিরাঙা ইউনিয়নের সাপমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে চারটি ওয়ার্ডের ৩৫টি পাড়ার ভোটাররা ভোট দেবেন। এই কেন্দ্রের অধিকাংশ ভোটারই ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার এবং হতদরিদ্র। ভোট কেন্দ্রটি থেকে একেকটি পাড়ার দূরত্ব পায়ে হাঁটা পথে কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার। এই কেন্দ্রের ভোটার সুমি ত্রিপুরা জানান, আলুটিলা টুরিস্ট এলাকায় একটি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করলে অনেক ভোটারের জন্য সুবিধা হতো।
রামগড় পৌরসভার ১০টি কেন্দ্রের মধ্যে আটটিই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। রামগড় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক নিজামউদ্দিন লাভলু বলেন, জনসংখ্যা এবং ভোটারবহুল এলাকা ও সীমান্ত বিবেচনায় এখানে ভোটকেন্দ্রগুলো সব সময়ই নিরাপদ পরিবেশই বজায় থাকে। ভোটকেন্দ্র যথেষ্ট থাকার কারণে রামগড় পৌর এলাকায় ভোট পড়ার হারও সব সময় বেশি থাকে।
পাতাছড়া ইউনিয়নে পাঁচটি কেন্দ্রের মধ্যে দু’টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। একটি কেন্দ্রের ভোটার নির্মল ত্রিপুরা জানান, ভোটারদের সংখ্যা, বসতি বৈচিত্র্য এবং দূরত্ব বিবেচনায় কেন্দ্র বাড়ানো হলে ঝুঁকিও কমে আসতো। ভোটারদেরও সুবিধা হতো।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাবেক সভাপতি ও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর বোধিস্বত্ত দেওয়ান মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূগোল-জনমিতি-বসতি-জীবন-জীবিকা এবং জীবনের মান বিবেচনা করেই সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্র বিন্যাস জরুরী। সমতলের চোখে কেন্দ্র বিভাজন হয় বলে অনেক ক্ষুদ্র নৃ-জাতিস্বত্ত্বা অধ্যুষিত এলাকায় ভোটাররা পড়ে থাকেন কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে। ফলে ওইসব এলাকায় ভোট পড়ার হারও সব সময় কমছে।
তিনি কেন্দ্র বিভাজনের আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (চেয়ারম্যান-মেম্বার) এবং প্রথাগত নেতৃত্ব (হেডম্যান-কার্বারী)-এর সঙ্গে আগাম মতবিনিময়ের ওপর জোর দেন।
খাগড়াছড়ি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম শাহাদাত হোসেন জানান, পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি)-এর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এসব কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সাধারণ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করে। তাদের সুপারিশ-প্রস্তাবনা আমরা নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করবো। শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের জন্য আমরা সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করব। আবার কিছু কিছু সমস্যা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমেও সমাধা করার চেষ্টা থাকবে।
খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার (এসপি) সায়েম মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, ভৌগলিক অবস্থান ও প্রার্থীরা যে কেন্দ্র্রগুলোতে ভোট দেবে সেগুলোকে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় করে থাকি। প্রতিটি কেন্দ্রে নির্ধারিত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া যেসব কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলোতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, টহল জোরদার এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।