শিরোনাম

ঢাকা, ১৪ জুন, ২০২৬ (বাসস) : চাকরি সৃষ্টি, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অবদান বাড়াতে ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে ৫জি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি ১০০ এমবিপিএস নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মোবাইল অপারেটর ও ফিক্সড ব্রডব্যান্ড সেবাদাতাসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে দেশের ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে ৫জি সেবা এবং ১০০ এমবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ইন্টারনেট সেবাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সরকার টেলিযোগাযোগ খাতে একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় স্বল্পমূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে ‘ন্যাশনাল ফাইবার ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
সরকারের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শেষে দেশে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ১৪ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৭০ হাজার মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ১ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার ব্যবহারকারী আইএসপি ও পিএসটিএন সেবার মাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছেন।
সরকারের বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান বর্তমান ১ থেকে ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতির কর্মসংস্থান সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ফ্রিল্যান্সিং ও সৃজনশীল শিল্পে ব্যাপক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও ৮ লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।
ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাতকে উৎসাহিত করতে বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর যে কর অব্যাহতি রয়েছে, তা সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, এর ফলে ফ্রিল্যান্সাররা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আয় দেশে আনতে আরও উৎসাহিত হবেন।
এ ছাড়া কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত সব ধরনের আয়কে আয়করমুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কনটেন্ট নির্মাতা ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) থেকেও সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে।
স্টার্টআপ খাতের বিকাশে নিবন্ধিত স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সেবা, আমদানি করা সেবা এবং অফিস ভাড়ার ওপর ১৫ শতাংশ মূসক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যবসার জন্য শূন্য শতাংশ টার্নওভার করহার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তায় এই তহবিল ব্যবহার করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই অর্থ নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
দেশের সব অঞ্চলে আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ সম্প্রসারণে সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে ন্যাশনাল ফাইবার ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংযোগ সুবিধা বাড়াতে ইতোমধ্যে রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরে বিনা মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার ও আউটসোর্সিং সেবাদাতাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে ‘স্মার্ট স্কিল ব্যাংক’ ও আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল সনদ প্রদানের জন্য একটি যাচাইকরণ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে।
পাশাপাশি কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও পলিটেকনিকগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে এক হাজার বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক এবং সাড়ে সাত হাজার দেশীয় প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
ডিজিটাল সেবায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কাজও চলছে। এর মাধ্যমে নাগরিকেরা একটি একক ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এবং টেলিযোগাযোগ সেবা আরও সহজলভ্য করতে মোবাইল সিমের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে বাজেটের এসব উদ্যোগকে যুগান্তকারী বলে মন্তব্য করেছেন প্রকৌশলী তাসলিমা আক্তার। বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজির সহ-সভাপতি তাসলিমা আক্তার বাসসকে বলেন, বাজেটে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা হয়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি এনে দেবে এবং প্রবৃদ্ধি বহুগুণে বাড়াবে। অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ কখনো পরিকল্পনা, প্রস্তাব কিংবা বাজেটের মাধ্যমে আইনগত রূপ দেওয়া হয়নি।
তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এই উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত।