শিরোনাম

দিদারুল আলম
ঢাকা, ১ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): আগামী এক দশকের মধ্যে কুমিল্লায় ৩৪১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক মেগাসিটি গড়ে তোলার কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নবগঠিত কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কুউক)।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কুউক) নবনিযুক্ত প্রথম চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু।
গত ১০ এপ্রিল ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন’ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এরপর ১১ জুন কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান উদবাতুল বারী আবু।
দায়িত্ব নিয়েই শূন্য থেকে এক চ্যালেঞ্জিং যাত্রা শুরু করেছেন তিনি। কুমিল্লা মহানগরীর জিরো পয়েন্টে গৃহায়ন ও গণপূর্ত ভবনে স্থাপিত হয়েছে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অফিস। সেখানেই এখন কর্মব্যস্ত দিন কাটে কুউকের প্রথম চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবুর।
তিনি জানান, কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নাগরিক সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় এনে দ্রুতই চালু করা হবে ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস)। পাশাপাশি রিং রোড নির্মাণ, ভূমি পুনর্বিন্যাস, ভূমি পুনঃউন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ, পর্যটন জোন, আইটি পার্ক এবং আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কুমিল্লাকে দেশের অন্যতম পরিকল্পিত নগরীতে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে উদবাতুল বারী আবু বলেন, কুমিল্লাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল একটি সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকনির্দেশনা এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ও কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমনের উদ্যোগে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ পেয়েছে।
তিনি বলেন, অধ্যাদেশ নয়, পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় কুউক একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।

একেবারে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে উদবাতুল বারী আবু বলেন, কোনো পূর্বপ্রস্তুত জনবল, অবকাঠামো বা প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়াই যাত্রা শুরু করা যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি এটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনেরও সুযোগ। পুরোনো কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা অকার্যকর প্রশাসনিক সংস্কৃতি না থাকায় শুরু থেকেই প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, কুউকের অধিক্ষেত্র শুধু কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রস্তাবিত ৩৪১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন, আদর্শ সদর উপজেলা, সদর দক্ষিণ উপজেলা, বুড়িচং উপজেলার সমৃদ্ধ জনপদ ময়নামতি ও মোকাম ইউনিয়নের অংশ এবং বাগমারা এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং বর্তমানে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছে।
কুউক চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু বলেন, কুমিল্লার পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাতারাতি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তবে নতুন আইনে সংযোজিত ভূমি পুনঃউন্নয়ন পদ্ধতির মাধ্যমে ধাপে ধাপে সড়ক প্রশস্ত করা, নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি জানান, নতুন মাস্টারপ্ল্যানে নগরীর যানজট নিরসনে রিং রোড নির্মাণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ, আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা এবং ময়নামতি ও শালবন বিহারের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে পর্যটন জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে একটি আধুনিক আইটি পার্ক প্রতিষ্ঠারও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় নতুন আইনের ভূমি পুনর্বিন্যাস ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে কুউক চেয়ারম্যান বলেন, এ ব্যবস্থায় প্রচলিত জমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে জমির মালিকদের অংশীদার করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পরিকল্পিতভাবে রাস্তা, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান ও জনসেবামূলক অবকাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা রেখে জমির মালিকদের উন্নতমানের প্লট ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এতে জমির পরিমাণ কিছুটা কমলেও এর বাজারমূল্য ও ব্যবহারিক সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
নাগরিক সেবা সহজীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ইমারত নির্মাণের অনুমতি, নকশা অনুমোদনসহ সব ধরনের সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। দ্রুতই ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হবে, যেখানে নাগরিকরা ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদন, নকশা দাখিল, ফি পরিশোধ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন পাবেন। এতে হয়রানি, সময়ক্ষেপণ, দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমে যাবে।
কুউকের চেয়ারম্যান আরও বলেন, সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধিত্ব থাকায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত হবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে দ্বৈততা দূর হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কুমিল্লার ঐতিহাসিক পুকুর, দিঘি ও জলাধারগুলোকে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় চিহ্নিত করে ডিজিটাল ম্যাপভুক্ত করা হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে এসব জলাধার ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে।
বর্তমান সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক অর্গানোগ্রাম অনুমোদন, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টি উল্লেখ করেন উদবাতুল বারী আবু। তিনি বলেন, একটি আধুনিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গড়ে তুলতে দক্ষ মানবসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুমিল্লাবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ কেবল সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। ভবন নির্মাণসহ সব উন্নয়ন কার্যক্রমে আইন মেনে চলা এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উন্নত নাগরিক জীবন নিশ্চিতে কুমিল্লায় দৃষ্টিনন্দন, বাসযোগ্য ও টেকসই আধুনিক নগরী প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কুউক চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং মহান জাতীয় সংসদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রাচীনতম জনপদ কুমিল্লার নানামুখী উন্নয়ন সাধনে গুরুত্ব অনুধাবন করে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা ও এই সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন মাইলফলক হয়ে থাকবে। এভাবেই বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের এক একটি এলাকার উন্নয়ন করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন’-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে সমন্বিত সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। কুমিল্লা ও এর সন্নিহিত এলাকার সমন্বয়ে একটি পরিকল্পিত আধুনিক নগর প্রতিষ্ঠায় ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ করা, দুর্যোগ সহনশীল নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং উন্নত নাগরিক জীবন নিশ্চিত করতে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বদ্ধপরিকর।
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রথম চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু একজন তুখোড় সংগঠক। তিনি কুমিল্লা মহানগর বিএনপি’র প্রথম নির্বাচিত সভাপতি। এর আগে তিনি কুমিল্লা মহানগর যুবদলের সভাপতি, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এছাড়াও ১৯৯৮ সালে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের সর্বশেষ নির্বাচনে নির্বাচিত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উদবাতুল বারী আবু। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ত্যাগী ও তুখোড় সংগঠক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন তিনি।