শিরোনাম

॥ রুমানা জামান ॥
ঢাকা, ৩০ মে, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন, স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও গণতন্ত্রহীন বাংলাদেশকে একটি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাঁর প্রবর্তিত ‘উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি’ কেবল তৎকালীন সংকটই দূর করেনি, বরং আজকের আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সুদূরপ্রসারী পথও তৈরি করে দিয়েছে।
৩০ মে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে বাসসকে দেওয়া একান্ত এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা এসব কথা বলেন।
মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে একটি ‘বাস্কেট কেস’ (তলাবিহীন ঝুড়ি) থেকে ‘সাকসেস কেস’ (সফল রাষ্ট্র)-এ রূপান্তর করেছিলেন বর্ণনা করে ড. মঈন খান বলেন, ‘স্বাধীনতার পরবর্তী নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণা প্রবর্তন করেন এবং এদেশের কোটি কোটি মানুষের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন। তার খাল খনন কর্মসূচি এবং কৃষিতে বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে এবং উদ্বৃত্ত চাল বিদেশে রপ্তানি করার সক্ষমতা অর্জন করে।’
তিনি বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই চালিকাশক্তি- তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের যে ভিত্তি, তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারারই ফসল। পোশাক শিল্পের জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধাসহ বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করে তিনি এই খাতকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছিলেন।
জিয়াউর রহমান কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, বরং সামাজিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ওপরও সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন উল্লেখ করে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘জিয়াউর রহমান তৎকালীন বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নারী ও শিশুর অধিকারের গুরুত্ব অনুধাবন করে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে বিশেষ বিভাগ খোলার পাশাপাশি গবেষকদের আধুনিক গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্রে নিরক্ষরতা দূরীকরণে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে তিনি একটি সামাজিক বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন।’
ড. মঈন খান বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বলয় থেকে বেরিয়ে এসে আমেরিকা এবং চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে। একইসঙ্গে মুসলিম বিশ্বের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। মুসলিম দেশগুলোর সাথে ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য তিনি বাংলাদেশের সংবিধানে একটি অনুচ্ছেদও যুক্ত করেন।’
তিনি জানান, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জোট ‘সার্ক’ গঠনের ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এছাড়া জিয়াউর রহমানের শাসনামলেই বাংলাদেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়।
ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ ৪৫ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে যে নতুন প্রজন্ম এসেছে, তারা জিয়াউর রহমান সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে না। এ কারণেই তাদের সামনে জিয়াউর রহমানের জীবনের সত্যিকারের দর্শন তুলে ধরতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কে? সেটা দেশের মানুষ সবাই জানেন। তবে তাঁকে সরাসরি জানার সুযোগ আমারও হয়নি। আমি তাঁকে জেনেছি দ্বিতীয় প্রজন্মের মাধ্যমে। প্রথম প্রজন্মে জিয়াউর রহমানকে সরাসরি চিনেছিলেন আমার বাবা আব্দুল মোমেন খান, যিনি জিয়াউর রহমানের সময়কালে খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। তবে দেশের বর্তমান তৃতীয় প্রজন্মের নাগরিকরা জিয়াউর রহমান সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি জানার সুযোগ পায়নি।’
জিয়াউর রহমানের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি চারণ করে বিএনপির এই প্রবীণ নেতা বলেন, ‘আমার সঙ্গে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যখন প্রথম সাক্ষাৎ হয়, আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি টিমকে বঙ্গভবনে ডেকে বলেছিলেন, আপনাদের এখানে ডেকেছি আমাকে একটি পরামর্শ দেওয়ার জন্য। অসীম ক্ষমতাবান একজন রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি শিক্ষকদের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আপনারা আমাকে পরামর্শ দেবেন বাংলাদেশের এনআরবি পলিসি (প্রবাসী বাংলাদেশি বিষয়ক নীতিমালা) কী হওয়া উচিত। সে সময় আমরা তাকে এনআরবি বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছিলাম, যা তিনি সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন। এতেই প্রমাণিত হয়, ক্ষমতার অহঙ্কার তার একেবারেই ছিল না।
জিয়াউর রহমানকে কাছ থেকে দেখা বিএনপির সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে আমরা হারিয়েছি এমন এক সময়ে, যখন দেশের কল্যাণ প্রত্যাশী জনগণ তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে উন্নয়ন ও শান্তি অর্জনের কর্মযজ্ঞে সক্রিয় ছিল এবং একটি নিশ্চিত ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় উজ্জীবিত ছিল। দেশ-বিদেশে যখন বাংলাদেশ মর্যাদা ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে ১৯৮১ সালের ৩০ মে শুধু জিয়াউর রহমানকে কেড়ে নেওয়া হয়নি; এ দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জোয়ারও থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। লাখ লাখ অশ্রুসিক্ত মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর যে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তা তাঁকে যে অতুলনীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে; তা অতিক্রম করার সৌভাগ্য আর কারও হবে কিনা, তা শুধুই ভবিষ্যৎ বলতে পারবে।’
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞে বিপর্যস্ত এ দেশের মানুষ একাত্তরের ২৭ মার্চ প্রথমবার ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’ শুনে যেমন উদ্বুদ্ধ ও সাহসী হয়েছিল; ঠিক তেমনি ’৭৫-এর ৭ নভেম্বর দেশের আরেক ভয়াবহ দুঃসময়ে ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি’ শুনে আশ্বস্ত ও নিশ্চিন্ত হয়েছিল। সবাই এসব সত্য জানে বলেই শহীদ জিয়ার স্মৃতি মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায়নি এবং কখনো মুছে ফেলা যাবেও না।’
জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’-এর ধারণা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক উল্লেখ করে ড. মঈন খান বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজের কিংবা পরিবারের জন্য কিছুই রেখে যাননি। এমন একজন মহাপ্রাণ দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা, মাতৃভূমিতে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী, দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির সোপান রচনাকারী, মহান মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ ফসল বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী এবং বাসযোগ্য ও মর্যাদাবান একটি রাষ্ট্র গঠনে তিনি ছিলেন জনগণের নির্ভরযোগ্য ও প্রত্যাশার বাতিঘর। দেশের ক্রান্তিলগ্নে তিনি দায়িত্ব নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।’