বাসস
  ১২ মে ২০২৬, ১২:২৫
আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ১৩:১৯

ডিসেম্বরের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মানের শিশুখাদ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা: মিল্কভিটা চেয়ারম্যান

মিল্কভিটা’র চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল। ছবি: বাসস

\ সাইফুল ইসলাম \

ঢাকা, ১২ মে, ২০২৬ (বাসস) : আন্তর্জাতিক মানের শিশুখাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্কভিটা)। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই পরিকল্পনার কথা জানান মিল্কভিটা’র চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল।

চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক মানের ল্যাকটোজেন-১, ২ ও ৩ ক্যাটাগরির শিশুখাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনে কাজ করছি। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত মান অর্জনের আশা করছি।’

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের বাজারে থাকা ‘ল্যাকটোজেন-১, ২ ও ৩’ ক্যাটাগরির শিশুখাদ্যের কোনোটিই দেশীয়ভাবে উৎপাদিত নয়। কারণ আন্তর্জাতিক মানের শিশুখাদ্য উৎপাদনে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সনদ, উচ্চমানের দুধ এবং অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো সেই পর্যায়ের মানসম্পন্ন কাঁচামাল ও অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। 

দুধের মান, ভেজাল নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত কেউ এ খাতে প্রবেশ করতে পারেনি।’

মিল্কভিটা চেয়ারম্যান বলেন, এ ধরনের পণ্য উৎপাদন খুব বেশি লাভজনক না হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। শুধু মুনাফার জন্য নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই মিল্কভিটা এ উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে শিশুখাদ্যের বাজার অনেক বড়। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বছরে আনুমানিক প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার শিশুখাদ্য আমদানি হয়। এর মধ্যে শুধু ল্যাকটোজভিত্তিক ফর্মুলা নয়, সেরেলাক-সহ বিভিন্ন ধরনের শিশুখাদ্য রয়েছে। বিভিন্ন চ্যানেলে পণ্য আমদানি হওয়ায় এই বাজারের প্রকৃত আকার নির্ধারণ করা কঠিন।

তিনি বলেন, দেশীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মানের শিশুখাদ্য উৎপাদন শুরু করা গেলে প্রাথমিকভাবে বাজারের ১০ থেকে ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এমনকি বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ টন উৎপাদন করলেও বাজারের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা যাবে। তবে মিল্কভিটা পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।

একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদিত দুধের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু, খামারিদের আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

মিল্কভিটা চেয়ারম্যান জানান, গত ১ এপ্রিল তার দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রতিদিন দুধ সংগ্রহের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার লিটার। বর্তমানে তা বেড়ে ২ লাখ ২৫ হাজার লিটারে উন্নীত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘শুধু সুশাসন ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ বাড়াতে সক্ষম হয়েছি। এখন আমাদের লক্ষ্য এটিকে ৪ লাখ লিটারে উন্নীত করা।’

আমীর হামজা শাতিল জানান, মিল্কভিটা শুধু দুধ সংগ্রহই করে না, খামারিদের স্বল্পমূল্যে গোখাদ্য, কৃত্রিম প্রজনন, ভ্যাকসিন, ওষুধ, প্রশিক্ষণ ও চারণভূমির সুবিধাও দিয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১ হাজার ৬৩ একর বাথানভূমি নামমাত্র মূল্যে সমবায়ী খামারিদের লিজ দেওয়া হয়।

খামারিদের আর্থিক সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, একটি বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য প্রায় ১২০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা চালুর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রোফাইলিংয়ের ভিত্তিতে এ ঋণ দেওয়া হবে।

তিনি জানান, কোরবানির ঈদের পর সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি এলাকায় এ প্রকল্পের পাইলট কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি খামারিকে আড়াই লাখ টাকা করে ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে।

মিল্কভিটা চেয়ারম্যান বলেন, ‘বর্তমানে সমিতির মাধ্যমে কৃষকদের অর্থ পরিশোধ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটালাইজ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রত্যেক কৃষকের ডিজিটাল প্রোফাইল থাকবে এবং সরাসরি তার অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাবে।

তিনি বলেন, ‘মিল্কভিটা শুধু একটি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের লাখো খামারি ও সমবায়ী কৃষকের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত একটি সামাজিক দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান। কৃষক যাতে উৎপাদিত দুধ বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তায় না পড়েন, সেজন্য মিল্কভিটা তাদের ‘বাইব্যাক গ্যারান্টি’ (উৎপাদিত পণ্য নিশ্চিতভাবে কেনার নিশ্চয়তা) দিয়ে যাচ্ছে।’

আমীর হামজা শাতিল বলেন, মিল্কভিটা’র উৎপত্তি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা সমবায় মডেল থেকে।

স্বাধীনতার পর এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হতে থাকে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ছিল প্রতিষ্ঠানটির স্বর্ণযুগ। বর্তমানে চালু থাকা অধিকাংশ কারখানা ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে স্থাপিত।

তিনি জানান, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মিল্কভিটায় অনেক নতুন যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সরকার সেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেনি। বর্তমানে সেগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

মিল্ক ভিটা চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর দেখেছি, মিল্কভিটা’র সম্পদ, অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও কারিগরি জনবলও কম। ফলে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে।’

তিনি বলেন, পুরোনো যন্ত্রের ওপর চাপ কমাতে নতুন যন্ত্র চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেসব যন্ত্রপাতি কিনেও চালু হয়নি, সেগুলো চালুর কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে একটি ‘রেশনাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালুর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মোহনপুরের গোখাদ্য কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বগুড়ার গাবতলীতে আইসক্রিম, ইউএইচটি মিল্ক ও চিজ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কাজও চলমান রয়েছে।

এছাড়া রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে দুগ্ধ উৎপাদন বাড়াতে নতুন দুগ্ধ কারখানা স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে দুধের গুণগত মান উন্নয়ন, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের শিশুখাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েও মিল্কভিটা কাজ করছে বলে জানান চেয়ারম্যান।

প্রতিষ্ঠানটির পুনঃব্র্যান্ডিং উদ্যোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, পণ্যের মোড়ক, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে রাজধানীতে ৩০টি মিল্ক ভিটা ব্র্যান্ড শপ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে সাধারণ মূল্যে প্রিমিয়াম মানের পণ্য পাওয়া যাবে।

কৃষকের উন্নয়নের লক্ষ্যে গবাদিপশুর উন্নত জাত বিস্তারে কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের গবাদিপশুর সিমেন আমদানির জন্য পরীক্ষামূলক অনুমোদন পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে জার্সি জাতের গরুর প্রজনন বাড়ানো হবে।

পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়েও মিল্কভিটা কাজ করছে উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, গবাদিপশুর খাদ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে মিথেন গ্যাস নিঃসরণ প্রায় ৩০ শতাংশ কমানোর জন্য গবেষণা চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিএলআরআই)-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে মিল্ক ভিটা।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিশ্চিত করা। মিল্কভিটা সেই জায়গাতেই কাজ করছে। কৃষক দুধ উৎপাদন করলে আমরা তা কিনে নেব-এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি।’

চেয়ারম্যান বলেন, ‘মিল্কভিটা চাইলে আমদানি করা পাউডার দুধ দিয়ে আরও বেশি লাভ করতে পারত। কিন্তু কৃষককে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় দুধ সংগ্রহ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। কারণ এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য শুধু লাভ নয়, কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।’

মিল্কভিটার উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে পাস্তুরিত তরল দুধ, ঘি, মাখন, মিষ্টি দই, টক দই, রসমালাই, রসগোল্লা, লাবাং, মাঠা, কেক, চকোবার, আইসক্রিম, ললিজ, প্যারা সন্দেশ, কাঁচাছানা সন্দেশ, স্পেশাল হাঁড়ি দই, ননীযুক্ত গুঁড়োদুধ, ননীবিহীন গুঁড়োদুধ, টোনড মিল্ক ও ফ্লেভার্ড মিল্ক।