বাসস
  ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৫৪

সুইডেনে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক

ঢাকা, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : সুইডেনে রোববারের সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে শেষদিকের একটি টেলিভিশন বিতর্কে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু ইস্যুতে পরস্পরকে তীব্র আক্রমণ করেন। এবারের নির্বাচনে দেশটিতে বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে ডানপন্থী সরকার ক্ষমতায় থাকলেও কয়েক মাস ধরে জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশ সুইডেনে উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থনপুষ্ট বর্তমান রক্ষণশীল জোটকে হারাতে পারে বামপন্থীরা। তবে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে বামপন্থীদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান কমে এসেছে।

২০ শতকের অধিকাংশ সময় সুইডেন শাসন করা সবচেয়ে বড় দল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা সংকটে থাকা পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সহায়তা এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বৃহস্পতিবারের বিতর্কে দলটির নেতা ম্যাগদালেনা আন্দেরসন বলেন, ‘সুইডিশ নাগরিকরা নিজ বাড়ির মালিক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারছেন খুব কম। জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। গত চার বছর ধরে বেকারত্ব বাড়ছে। সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় একই বেতনে আগের তুলনায় কম জিনিসপত্র কেনা যাচ্ছে।’

এর জবাবে রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন বলেন, ‘দুটি স্বাভাবিক বেতন দিয়ে একটি ছোট বাড়ি কেনার মতো সামর্থ্য থাকা উচিত। আর এ জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর-সুবিধা প্রয়োজন, যাতে মানুষ নিজেদের প্রথম বাড়ি কেনার অগ্রিম অর্থ জমাতে পারেন।’

এদিকে উগ্র ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা জিমি অকেসন বলেন, বেকার অভিবাসীদের দেশে থাকার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকে আসা এই মানুষগুলো যদি সুইডেনের শ্রমবাজারে কাজ করার উপযুক্ত না হন, তাহলে তাদের হয় চাকরি নিতে হবে, নয়তো দেশ ছাড়তে হবে।’

২০২২ সালে ক্রিস্টারসন ক্ষমতায় আসেন। ওই সময় তার নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু জোট সরকার সুইডেন ডেমোক্র্যাটসের সঙ্গে একটি নজিরবিহীন চুক্তি করে। এর বিনিময়ে পার্লামেন্টে সরকারের প্রতি সমর্থন দেয় উগ্র ডানপন্থী দলটি এবং সরকারের নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়।

একসময় রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হিসেবে বিবেচিত সুইডেন ডেমোক্র্যাটস এখন দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। জনমত জরিপে দলটির সমর্থন প্রায় ২০ শতাংশ।

ডানপন্থীরা নির্বাচনে জয়ী হলে প্রথমবারের মতো সুইডেন ডেমোক্র্যাটসকে সরকারে মন্ত্রিত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্রিস্টারসন।

অকেসনকে অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া তার দল আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দাবি করেছে।

আন্দেরসন সুইডিশদের সতর্ক করে বলেন, ‘সোমবার সকালে আমরা এমন একটি সরকারের অধীনে ঘুম থেকে উঠতে পারি, যেখানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সুইডেন ডেমোক্র্যাটসের হাতে তুলে দেওয়া হবে। অথচ এই দলের ভেতরে পুতিনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। তাই এমন ঝুঁকি নেবেন না।’

অকেসন তার এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ‘তিনি এতটা নিচে নেমে গেছেন!’

সোদেরতর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মারজা লেমনে এএফপিকে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল এখনো ‘খুবই অনিশ্চিত’।

তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা জনসমর্থন হারাচ্ছে।’ যদিও নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুবিধার মতো ঐতিহ্যগত বামপন্থী বিষয়গুলোই আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে।

অন্যদিকে ডানপন্থী দলগুলো অপরাধ ও অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা, আয়কর কমানো এবং প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বুধবার প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপে বামপন্থী চার দল- সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস, গ্রিনস, সেন্টার পার্টি ও লেফট পার্টি—মোট ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে।

অন্যদিকে ক্রিস্টারসনের মডারেটস, সুইডেন ডেমোক্র্যাটস, ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটস ও লিবারেলস নিয়ে গঠিত ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ সমর্থন।

বামপন্থীরা এগিয়ে থাকলেও তাদের সরকার গঠন কেমন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন লেমনে।

তিনি বলেন, এটি খুবই বিভক্ত  এবং দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও অনেক।’

সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করতে আন্দেরসনকে বামপন্থী জোটের অন্য তিনটি দলের সমর্থন প্রয়োজন হবে। এ জন্য তিনি তিন দলের সঙ্গেই আলোচনা করতে প্রস্তুত।

তবে কৃষিভিত্তিক সেন্টার পার্টি আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছে, সাবেক কমিউনিস্ট লেফট পার্টির সঙ্গে তারা কোনো সরকারে যাবে না। এ ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে আদর্শগত ও অর্থনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে।

একই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের পক্ষেও লেফট পার্টিকে সরকারে নেওয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমে লেফট পার্টির কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষী প্রচারণা ছড়ানো এবং ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাসের প্রশংসা করার অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

এদিকে ক্রিস্টারসনের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোটের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করছে ছোট দল লিবারেল পার্টির ওপর। দলটি পার্লামেন্টে আসন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৪ শতাংশ ভোটের সমর্থন অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে।