শিরোনাম

ঢাকা, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : ভয়াবহ বন্যায় নেপালের হিমালয়সংলগ্ন সীমান্ত অঞ্চল বিপর্যস্ত হওয়ার এক সপ্তাহ পরও নিখোঁজ বিদেশিদের স্বজনেরা আশা ছাড়ছেন না। তারা নিখোঁজদের কোনো সন্ধান পাওয়ার আশায় হাসপাতাল ও মর্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
কাঠমান্ডুর পর্যটন পুলিশ সদর দপ্তরের বাইরে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন সঞ্জীব রাই। ৫৩ বছর বয়সী এই আমেরিকান নাগরিক তার স্ত্রী জীবন জ্যোতির নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে নেপালে ছুটে আসেন। পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রা শেষে ফেরার পথে তার স্ত্রী নিখোঁজ হন। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে কৈলাস একটি পবিত্র পর্বত।
কাঠমান্ডু থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
রাই এএফপিকে বলেন, ‘আমি যেদিন এখানে পৌঁছাই, সেদিনই বলেছিলাম, চলুন একটি হেলিকপ্টার খুঁজে বের করি। আমি তাকে খুঁজতে যাব।’ তবে দুর্যোগের সময় জ্যোতি রাসুয়া জেলার তিমুরে গ্রামে ছিলেন। গ্রামটি এখনো দুর্গম ও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি খুবই হতাশ। এতগুলো দিন পার হয়ে গেছে।’ ইন্টেলে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত জ্যোতি আধ্যাত্মিক সাধনা ও অভিযানের অংশ হিসেবে এই যাত্রায় গিয়েছিলেন। তার ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে তিনি এই ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। এখন রাই জীবিত অবস্থায় স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি আর জীবিতদের ফিরে পাওয়ার আশা করছি না। শুধু আশা করছি, ডিএনএ নমুনা মিলে যাবে। আমি যেন তার জন্য শোক করতে পারি, সেটাই চাই।’ ২৬ আগস্টের বন্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিমালয়ের এই দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্যোগগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
প্রচণ্ড স্রোতে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের আঘাতে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ৭৫০ জনের বেশি। এতে শহর, সড়ক, সেতু এবং একাধিক জলবিদ্যুৎ বাঁধ বিধ্বস্ত হয়েছে।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৯৪ জন বিদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই চীন ও ভারতের নাগরিক। তবে ৫৮৩ জন বিদেশির এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাদের অনেকেই কৈলাস পর্বতের চারপাশে কঠিন তীর্থযাত্রার জন্য কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
নিখোঁজদের মধ্যে আধ্যাত্মিক গুরু সদগুরুর ইশা ফাউন্ডেশনের ৭৭ জন তীর্থযাত্রী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকও রয়েছেন।তাদের কয়েকজন স্বজন উত্তর খুঁজতে কাঠমান্ডুতে এসেছেন। ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকেরাও তাদের সহায়তা করছেন।
-‘কেউ সরে যেতে পারেনি’-
অরুণ মেহতা বলেন, ‘যাদের উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে তথ্য পেতে আমরা প্রতিদিন নেপাল পুলিশের কাছে যাই। পুলিশ প্রকাশিত ছবিগুলোও আমরা পরীক্ষা করি।’ অন্যরা দিনের বেশির ভাগ সময় হাসপাতালে গিয়ে কাটাচ্ছেন।
তবে তিন নেপালি গাইডসহ দলটির সবাই এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে মেহতা জানান। তিনি বলেন, ‘তারা কৈলাস পর্বতের চারপাশে তীর্থযাত্রা শেষ করেছিলেন। এরপর চীনের সঙ্গে সীমান্তের গিরং সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রে অভিবাসনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছিলেন। তখনই দুর্যোগ আঘাত হানে।’
ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ নিখোঁজদের শনাক্ত করার বিভিন্ন তথ্য কর্তৃপক্ষকে দিয়েছে। এর মধ্যে অনেক তীর্থযাত্রীর পরা সাপের আকৃতির বিশেষ আংটি ও লকেটের তথ্যও রয়েছে। নেপাল পুলিশ চলতি সপ্তাহে নিখোঁজদের স্বজনদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছে। মরদেহ শনাক্ত করতে এসব নমুনা দিয়ে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। বিদেশে থাকা স্বজনেরা নিজ নিজ দেশ থেকেও নমুনা জমা দিতে পারবেন।
নেপাল থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলেও কয়েকজন স্বজন নেপালে গিয়ে অনুসন্ধানে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইয়াকুতস্ক থেকে নিখোঁজ সংগীতশিল্পী কিরিল ত্রেতিয়াকভের ভাই জানিয়েছেন, তিনি কয়েক দিনের মধ্যেই নেপালে যাবেন।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে কিরিলের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা আশা করছি, তার দলটি বেঁচে আছে। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা নেই।’ ত্রেতিয়াকভ তাশি দেলেক নামের একটি ভ্রমণ সংস্থার আয়োজনে রাশিয়া ও ইউক্রেনের তীর্থযাত্রীদের একটি দলের সঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা হাসপাতালগুলো থেকে খোঁজ শুরু করব। যত সময়ই লাগুক, আমরা তাকে খুঁজতে থাকব।’
ট্রেকিং আয়োজক প্রতিষ্ঠান ফিশটেইল জানিয়েছে, তারা ২০ জন তীর্থযাত্রীর একটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়েছে। তাদের বেশির ভাগই মালয়েশিয়ার নাগরিক। তাদের সঙ্গে গাইড ও গাড়িচালকরাও ছিলেন। বিক্রয় প্রতিনিধি নিমসাং গুরুং বলেন, ‘ ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে কেউ সড়ে যেতে পারেনি ।’
অব্যাহত থাকলেও কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এই দুর্যোগে দেশটির পর্যটন খাতে বড় ধরণের প্রভাব পড়বে। পর্যটন নেপালের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। নেপালের ন্যাশনাল ট্যুরিজম এজেন্সির সুনীল শর্মা বলেন, ‘এই দুর্যোগে পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মাত্র চারটি জেলা’ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।