বাসস
  ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৯

অভিবাসন ও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বৈঠকে বসছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও মাখোঁ

ঢাকা, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : লন্ডনে প্রদর্শনীর জন্য ধার দেওয়া ফ্রান্সের ঐতিহাসিক বেয়ু ট্যাপেস্ট্রি দেখে মুগ্ধ হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসছেন। বৈঠকে অভিবাসী বহনকারী নৌকা ও ইউক্রেন যুদ্ধ গুরুত্ব পাবে। 

প্রায় ৭০ মিটার (২৩০ ফুট) দীর্ঘ এবং ৫০ সেন্টিমিটার (২০ ইঞ্চি) উঁচু একটি সূচিকর্ম করা কাপড় বেয়ু ট্যাপেস্ট্রি। এতে ১০৬৬ সালে ইংল্যান্ডে নরম্যানদের বিজয়ের আগে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। 

বুধবার সন্ধ্যায় ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ট্যাপেস্ট্রির প্রদর্শনীর উদ্বোধনী পূর্বপ্রদর্শনী অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো দুই নেতা সাক্ষাৎ করেন। রাজা তৃতীয় চার্লসও এতে উপস্থিত ছিলেন।

লন্ডন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

উভয় পক্ষই এই অনুষ্ঠানকে দুই দেশের ইতিবাচক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি আশা করেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ‘হাজার বছরের পুরোনো এই সূচিকর্মের সুতার মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া দুই দেশের শতাব্দীজুড়ে অভিন্ন ইতিহাসের কাহিনি’ স্মরণ করবে।

প্রায় এক দশক ধরে ট্যাপেস্ট্রিটি যুক্তরাজ্যে ধার দেওয়ার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মাখোঁ। ব্রেক্সিটের বছরগুলোতে তৈরি হওয়া তিক্ততা কাটিয়ে ওঠার পথে এই প্রদর্শনীকে আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একাদশ শতাব্দীর এই শিল্পকর্মে উইলিয়াম দ্য কনকারারের ইংল্যান্ড জয় দেখানো হয়েছে। জুলাই মাসে এটি লন্ডনে পৌঁছায়। প্রদর্শনীটির সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।

বার্নহাম তার বক্তব্যে এটিকে ‘আশাবাদ ও প্রত্যাশায় পূর্ণ নতুন ভবিষ্যৎ’ গড়ার সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।

বার্নহামের আমলে ডাউনিং স্ট্রিটে আমন্ত্রিত প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতা হতে যাচ্ছেন মাখোঁ। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জুলাইয়ে সেখানে সফর করেছেন।

মাখোঁর জন্য এ সফর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের শেষ সময় ঘনিয়ে আসছে। তার মেয়াদ ২০২৭ সালের মে মাসে শেষ হওয়ার কথা।

-‘আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই’-

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে যৌথ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হবে।

বুধবার বার্নহাম ফরাসি সাংবাদিকদের বলেন, ‘অভিবাসন নিয়ে আমরা ফরাসি সরকারের সঙ্গে কাজ করছি। একসঙ্গে আরও অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে।’

ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, নেতারা ‘মেগা ডিঙ্গি’ বা আরও বড় ও শক্তিশালী নৌকার ব্যবহার ঠেকানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করবেন।

এ ধরনের নৌকা নিয়ে অভিবাসীদের যাত্রা ঠেকাতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৪৫ জন ফরাসি কর্মকর্তা নিয়ে গঠিত একটি ‘সার্জ টিম’ সৈকতে মোতায়েন করা হবে বলে ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে।

সরকার সোমবার জানিয়েছে, চলতি গ্রীষ্মে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে অভিবাসী বহনকারী ছোট নৌকার সংখ্যা ২০১৯ সালের পর সবচেয়ে কম ছিল। ফ্রান্সের সঙ্গে করা প্রয়োগমূলক চুক্তির সাফল্য হিসেবে সরকার এটিকে তুলে ধরেছে।

তবে বৈঠকের আগে ডাউনিং স্ট্রিটে দেওয়া এক বিবৃতিতে বার্নহাম বলেন, ‘আমাদের আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। চোরাচালানকারী চক্রগুলো নিয়মিত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে দ্রুত এর জবাব দিতে হবে।’

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতি লন্ডনের সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন বার্নহাম। তিনি তার প্রথম বিদেশ সফরে কিয়েভ যান।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দেওয়া বক্তব্যে মাখোঁ বার্নহামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইউক্রেনের জন্য আমাদের স্বেচ্ছাসেবী জোটের যৌথ উদ্যোগও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি ইউক্রেনকে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র স্ক্যালপের বিভিন্ন উপাদানসংক্রান্ত তথ্য যুক্তরাজ্যের সরবরাহের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। ফ্রান্সে তৈরি স্ক্যালপ হলো যুক্তরাজ্যের স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্রের ফরাসি সংস্করণ।

মাখোঁ ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী  কেয়ার স্টারমারের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল। ইউক্রেনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর জোটে তারা নেতৃত্বের ভূমিকাও পালন করেছেন।

বার্নহাম বুধবার ফরাসি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্রিটেনে হয়তো প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ইউক্রেনের বিষয়ে আমাদের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।’

ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।

-পারস্পরিক সম্মান-

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়—এমন ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠায় মাখোঁ এখনো আগ্রহী। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পরও এ ক্ষেত্রে ব্রিটেনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মতো দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট বুধবার বলেন, প্যারিস ও লন্ডন ‘সব বিষয়ে সবসময় একমত হয় না’। তবে ‘আমরা পরস্পরকে সম্মান করি এবং সব বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক পুনর্গঠনের অগ্রগতিও রয়েছে।’

যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তোলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী বার্নহাম।

তিনি বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমার পূর্বসূরি যা অর্জন করেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।’

বার্নহাম বলেন, ‘ব্রেক্সিটের ১০ বছর পর এখানকার মানুষ দিকনির্দেশনার অভাবে বিরক্ত। তারা বুঝতে পারছেন, আমাদের আরও ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।’

তবে কিংস কলেজ লন্ডনের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ মেনন সতর্ক করে বলেছেন, বৈঠকে ‘সারবস্তুর চেয়ে কৌশল বেশি গুরুত্ব পাওয়ার’ ঝুঁকি রয়েছে।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আপনারা যত খুশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আবহ তৈরি করতে পারেন। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনায় আমাদের অগ্রগতি প্রয়োজন। আর আমার ধারণা, সেখানে কোনো অগ্রগতি হবে না।’