শিরোনাম

ঢাকা, ৩ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): মিয়ানমারে বন্দি গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চি সোমবার দেশটিতে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কোনো বিদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে এটি সু চির প্রথম প্রকাশ্য সাক্ষাৎ।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী এই নেত্রীকে কারাবন্দি করার পর দেশটিতে চলমান গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যাতে পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডি’র তথ্য অনুযায়ী এক লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং চলতি বছরের এপ্রিলে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সু চির দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিয়ে এই নির্বাচন আয়োজন করা হয় মিন অং হ্লাইংয়ের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে।
ইয়াঙ্গুন থেকে এএফপি জানায়, সু চির ছেলে কিম অ্যারিস সোমবার রেড ক্রসের সঙ্গে তার মায়ের সাক্ষাৎকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এতে আশার সঞ্চার হয়েছে।
ব্রিটিশ নাগরিক কিম অ্যারিস স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ চেয়ে আসছিলেন যে তার মা জীবিত আছেন। এপ্রিলে মিন অং হ্লাইংয়ের অবস্থান পরিবর্তনের পর সু চিকে কারাগার থেকে গৃহবন্দি অবস্থায় স্থানান্তর করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এই সাক্ষাতের মাধ্যমে তিনি আশা করছেন— তার মায়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হবে, তার শারীরিক অবস্থার স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তার মা ও সব রাজনৈতিক বন্দির নিঃশর্ত ও অবিলম্বে মুক্তি নিশ্চিত হবে।
আইসিআরসির এক মুখপাত্র এএফপিকে জানান, সংস্থাটির মিয়ানমার প্রতিনিধি আর্নো দ্য বাক সোমবার সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
আইসিআরসি এক বিবৃতিতে জানায়, ওই সাক্ষাতে সু চির সঙ্গে একান্তে কথা বলার সুযোগও ছিল।
এর আগে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এ সাক্ষাতের ঘোষণা দিয়ে সু চি ও দ্য বাকের করমর্দন এবং আলোচনায় বসার দুটি ছবি প্রকাশ করে।
আইসিআরসির মুখপাত্র ছবি দুটির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এগুলো তাদের সংস্থা তোলেনি।
বর্তমানে ৮১ বছর বয়সী সু চিকে গৃহবন্দি অবস্থায় নেওয়া হয়, যখন মিন অং হ্লাইং তার অবশিষ্ট সাজা লঘু করার ঘোষণা দেন।
সু চির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে মামলা করা হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাকে ও তার জনপ্রিয় দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)কে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্যই আনা হয়।
এনএলডির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে বলেন, ‘যদি সত্যিই এটি আইসিআরসির সঙ্গে তার সাক্ষাতের ছবি হয়, তাহলে আমরা তাকে এভাবে দেখতে পেরে আনন্দিত। অন্তত এখন নিশ্চিত হওয়া গেল তিনি জীবিত আছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে আন্টিকে (সু চি) অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে, কারণ তাকে অবৈধভাবে আটক রাখা হয়েছে।’
কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত রাজধানী নেপিদোতে সু চিকে কোথায় রাখা হয়েছে বা তার সাজা থেকে আর কত বছর বাকি রয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
আইসিআরসি তাদের নীতিমালার কথা উল্লেখ করে সু চির অবস্থান বা স্বাস্থ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য জানায়নি। সংস্থাটি বলেছে, বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রাপ্ত তথ্য কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গেই ভাগাভাগি করা হয়।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমার অনেকটাই একঘরে হয়ে পড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মিন অং হ্লাইং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করছেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১ দেশের জোট আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্র মিয়ানমারের নেতৃত্বকে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনগুলোতে অংশ নিতে দেয়নি।
তবে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড দ্বিপক্ষীয়ভাবে এবং আসিয়ানের মাধ্যমে মিয়ানমারকে আবারও কূটনৈতিক পরিসরে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মিন অং হ্লাইং ভারত, চীন ও আসিয়ানভুক্ত লাওস সফর করেছেন। চলতি সপ্তাহে তার থাইল্যান্ড সফরেরও কথা রয়েছে।
স্বাধীন বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন এএফপিকে বলেন, ‘সু চিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পুরোনো কৌশল।’
তিনি বলেন, আসিয়ানের কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে সু চির জীবিত থাকার প্রমাণ চেয়ে আসছিল। তাই ব্যাংকক সফরের কয়েক দিন আগে সরকার-অনুমোদিত এই সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ মোটেও কাকতালীয় নয়।
তার ভাষায়, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এটি এমন একটি ইঙ্গিত, যা মিন অং হ্লাইং এতদিন নিজের তুরুপের তাস হিসেবে ধরে রেখেছিলেন।’
মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলস বলেন, সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দিয়ে মিয়ানমার সরকার ‘আসিয়ানের কাছ থেকে অনেক কিছু অর্জন করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে সু চিকে মুক্তি দিলে রাজনৈতিক পর্যায়ে মিয়ানমারকে আবারও আসিয়ানে স্বাগত জানানোর পথ অনেকটাই সুগম হবে।’
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও সু চির অব্যাহত আটকাবস্থা অনেক দেশের কাছে এখনো বড় একটি বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
আসিয়ান তাদের বিশেষ দূতকে সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।