শিরোনাম

ঢাকা, ২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : নতুন করে সংস্কার করা ভিলনিয়াস বিমানবন্দরে প্রবেশ করতেই দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে ‘মেড ইন লিথুয়ানিয়া’ পণ্যের বিজ্ঞাপনে ভরা বিলবোর্ড। এর মধ্যে রয়েছে সাইবার নিরাপত্তা খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান নর্ডভিপিএন।
ইতালি বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলো যেখানে এ ধরণের প্রচারণায় ঐতিহ্য বা কারুশিল্পকে তুলে ধরে, সেখানে লিথুয়ানিয়া এবং এর প্রতিবেশী বাল্টিক দেশ এস্তোনিয়া ও লাটভিয়া নিজেদের উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরছে।
ভিলনিয়াস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
এই তিন দেশে এখন বিশ্বজুড়ে পরিচিত স্টার্টআপের সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম ভিনটেড, রাইড শেয়ারিং সেবা বোল্ট এবং ভিডিও টেলিফোনি সেবার পথিকৃৎ স্কাইপ।
লাটভিয়ার ব্যবসা ও আর্থিক তথ্যভান্ডার ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লুরসফট আইটির তথ্য অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যা মাত্র ৬০ লাখের কিছু বেশি হলেও গত বছর বাল্টিক দেশগুলোতে প্রায় ৩৩ হাজার স্টার্টআপ ছিল।
প্র্যাকটিকা ক্যাপিটাল এবং ফার্স্টপিকের খাতভিত্তিক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে এসব স্টার্টআপের অর্থায়ন ২০ শতাংশ বেড়ে ৬০ কোটি ৭০ লাখ ইউরোতে (৭০ কোটি ডলার) পৌঁছেছে।
বর্তমানে বাল্টিক দেশগুলোতে ১৭টি ‘ইউনিকর্ন’ রয়েছে। অর্থাৎ, যেসব স্টার্টআপের বাজারমূল্য ১০০ কোটি ডলারের বেশি।
উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতার উন্মেষ
চার দশকেরও কম সময় আগে এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া স্বাধীনতা ফিরে পেলেও তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির অদক্ষ কারখানাগুলোর উত্তরাধিকার পেয়েছিল।
লাটভীয়-মার্কিন উদ্যোক্তা গির্টস গ্রাউডিনস বলেন, ‘স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার মাধ্যমে সোভিয়েত শাসনে দমিয়ে রাখা উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতার বিকাশ ঘটে।’ তিনি বলেন, বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই এই অঞ্চল বিজ্ঞান ও উৎপাদন খাতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
এস্তোনিয়ার তারতু বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বিষয়ে শিক্ষক কাদরি উক্রাইনস্কি বলেন, ‘সোভিয়েত আমলে আমাদের টেলিফোন ব্যবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না।’ এই বাস্তবতা থেকেই এস্তোনিয়ার প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত ইউনিকর্ন স্কাইপের জন্ম।
তার ভাষায়, একসময় পিছিয়ে থাকা দেশটিকে এগিয়ে নিতে স্কাইপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটি ‘অত্যন্ত অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা’ কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছে।
২০০৩ সালে দুইজন স্ক্যান্ডিনেভীয় উদ্যোক্তা এবং এস্তোনিয়ার চারজন ডেভেলপার মিলে স্কাইপ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এর নিবন্ধিত ব্যবহারকারী সংখ্যা ৫ কোটি ছাড়ায়। একই বছর প্রায় ২৬০ কোটি ডলারে এটি অনলাইন নিলাম প্রতিষ্ঠান ইবের কাছে বিক্রি করা হয়।
২০০৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার ফলে বাল্টিক দেশগুলো ইউরোপের বাজারে প্রবেশের সুযোগও পায়।
মাত্র ১৩ লাখ জনসংখ্যার দেশ এস্তোনিয়ায় বর্তমানে ১০টি সক্রিয় ইউনিকর্ন রয়েছে। জনসংখ্যার অনুপাতে যা ইউরোপে সর্বোচ্চ।
স্টার্টআপের ‘গুণিতক প্রভাব’
মাইক্রোসফট ২০১১ সালে স্কাইপ কিনে নেওয়ার পর গত বছর অ্যাপটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে বাল্টিক অঞ্চলের প্রথম ইউনিকর্ন হিসেবে এর প্রভাব এখনো রয়েছে।
‘স্কাইপ মাফিয়া’ নামে পরিচিত এ প্রভাবে প্রতিষ্ঠাতা ও শুরুর দিকের কর্মীরা স্কাইপে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এতে অন্যরাও উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত হন।
লিথুয়ানিয়ার প্রথম ইউনিকর্ন, ব্যবহৃত পোশাক কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম ভিনটেডও একই ধরণের প্রভাব ফেলেছে।
প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জেসি দে লা মার্সেড বলেন, ‘ভিনটেডের পথচলা লিথুয়ানিয়ার স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের সামগ্রিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।’ তার মতে, প্রতিষ্ঠানটির উপস্থিতি ‘গুণিতক প্রভাব’ সৃষ্টি করেছে।
২০১৯ সালে ইউনিকর্নে পরিণত হওয়া ভিনটেডের বাজারমূল্য গত এপ্রিল মাসে ৮০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে লিথুয়ানিয়ায় মোট ছয়টি ইউনিকর্ন রয়েছে।
স্টার্টআপ লিথুয়ানিয়ার প্রধান ক্যারোলিনা উরবোনাইতে বলেন, ইউনিকর্নগুলোর ইতিবাচক প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ছে। সরকারি এই প্রতিষ্ঠান দেশের স্টার্টআপ খাতকে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের স্টার্টআপগুলো বিপুল পরিমাণ কর দেয়। তারা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।’ তিনি জানান, লিথুয়ানিয়ার স্টার্টআপগুলোতে মোট ২০ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করছেন। তারা উচ্চ বেতন পাচ্ছেন এবং এসব প্রতিষ্ঠান দেশে বিদেশি বিনিয়োগও আকর্ষণ করছে।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) শিক্ষার ওপর বাল্টিক দেশগুলোর বিশেষ গুরুত্বও নতুন প্রজন্মের ফিনটেক উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে সহায়ক হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সর্বশেষ পিসা মূল্যায়নে বাল্টিক অঞ্চলের স্টেম শিক্ষার্থীরা ফ্রান্স, সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো ফল করেছে।