শিরোনাম

ঢাকা, ৩০ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : রাশিয়ার দখলকৃত সংযুক্ত করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সেভাস্তোপোল শহরের আকাশে হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এটি কি রুশ বিমান প্রতিরক্ষা মহড়া, নাকি ইউক্রেনের ড্রোন হামলা?
স্থানীয় বাসিন্দা জর্জি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, এতে আর অবাক হওয়ার কিছু নেই।
সেভাস্তোপোল থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘এসবের সঙ্গে আমরা এখন অভ্যস্ত। সত্যি বলতে, এখন আর কিছুই আমাদের ভয় দেখাতে পারে না।’
সাড়ে চার বছরের যুদ্ধ চললেও কৃষ্ণসাগর উপকূলের এই অঞ্চল এখনো জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন পর্যটনকেন্দ্র। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে ইউক্রেন।
তারপরও পর্যটন খাতে কর্মরত জর্জির মতো অনেকেই স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমরা এখানে বসে কফি খাচ্ছি। কোনো শব্দ শোনা গেলেও সেটি সম্ভবত মহড়ার অংশ।’ নিরাপত্তার কারণে নিজের পদবি প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
সমুদ্রতীরে দেখা গেছে বয়স্ক নারীরা পানিতে নেমেছেন। এক শিশু তার ভাইয়ের গায়ে পানি ছিটাচ্ছে। সুগঠিত দেহের কয়েকজন পুরুষ ব্যায়াম করছেন।
স্কেটপার্কে শহরের অসংখ্য বোমা আশ্রয়কেন্দ্রের একটির পাশে কিশোররা স্কেটবোর্ডে নানা কসরত করছে।
সেভাস্তোপোলের গভর্নরের টেলিগ্রাম চ্যানেল যাচাই করে এ সময় কোনো বিমান হামলার সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি।
তবে জুন মাস থেকে ইউক্রেন হামলা বাড়ানোর পর এমন সতর্কবার্তা আরও ঘন ঘন দেওয়া হচ্ছে।
এসব হামলায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে।
ক্রিমিয়ার গভর্নর সের্গেই আকসিওনভ বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোরের মধ্যে হওয়া হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জ্বালানির সংকট এখন ক্রিমিয়ার ২৪ লাখ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান ক্রিমএনারগো প্রতিদিন তাদের ওয়েবসাইটে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার সময়সূচি প্রকাশ করছে।
কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে স্থানীয় জরুরি অবস্থা জারি করেছে। পেট্রোল বিক্রিও বন্ধ রাখা হয়েছে।
-'বিপর্যয়’-
সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশকেন্দ্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যেসব হোটেলের সামর্থ্য রয়েছে, তারা জেনারেটরের ব্যবস্থা করেছে।
২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে রাশিয়া। এর জেরে পশ্চিমা দেশগুলো প্রথম দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
ক্রিমিয়া রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের জন্য প্রতীকী ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি স্থানীয়দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিয়েভের তুলনায় মস্কোর শাসনে তারা আরও ভালো জীবন পাবেন।
তবে বিশ্বের প্রায় কোনো দেশই ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর চার বছরেরও বেশি সময় পর এখন ক্রিমিয়ার বিভিন্ন সড়কে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চোখে পড়ে।
ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রগুলোর আংশিক দগ্ধ ভবনও দেখা যায়। অনেক পেট্রোলপাম্প বন্ধ রয়েছে। আবার কোথাও শুধু জরুরি পরিবহনের জন্য জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা কখনো কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ চালকদের জন্য পেট্রোল বা ডিজেল বিক্রির ঘোষণা দেন।
৯৫ অকটেন আনলেডেড পেট্রোলের প্রতি লিটারের দাম এখন প্রায় ২৫০ রুবল, যা প্রায় ৩ ডলারের সমান। এটি আগের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি।
রাশিয়া থেকে সরবরাহ আনা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ ইউক্রেন হয়ে ক্রিমিয়া ও রস্তভ-অন-দনের মধ্যকার উত্তরাঞ্চলীয় পথে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকার ও পণ্যবাহী যানবাহনে ইউক্রেন প্রায়ই হামলা চালায়।
এ পথ এখন ‘মৃত্যুর সড়ক’ নামে পরিচিত।
-'মুকুটের রত্ন'-
রাশিয়ায় যাওয়ার আরেকটি পথ হলো পূর্বদিকে কের্চ সেতু। সড়ক ও রেল সংযোগের এ ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বহুমূল্যের সেতুটি মস্কোর ক্রিমিয়া সংযুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেন একাধিকবার এ সেতুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালের এক হামলায় বিস্ফোরকভর্তি একটি ট্রাক সেতুর ওপর নিয়ে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
বর্তমানে জ্বালানিবাহী ট্যাংকারের এ সেতু ব্যবহার নিষিদ্ধ।
কের্চ সেতু আবার অচল হয়ে গেলে বিকল্প পরিকল্পনা কী হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষক মারিয়া স্নেগোভায়া এএফপিকে বলেন, ‘২০১৪ সালের পর রাশিয়ার ভূখণ্ড দখলের ইতিহাসে ক্রিমিয়াই সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন। এটিকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় কাহিনি গড়ে তোলা হয়েছে।’
তিনি বলেন, দনবাস দখলকে মূলত রুশভাষীদের সুরক্ষার যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা হলেও ক্রিমিয়াকে ঐতিহাসিকভাবে পবিত্র রুশ ভূমি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
যুদ্ধ শুরুর পর অনেক বাসিন্দা ক্রিমিয়া ছেড়ে চলে গেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।
গত মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ক্রিমিয়ায় অভিযানের উদ্দেশ্য হলো ‘এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যাতে রাশিয়া শান্তি বেছে নিতে বাধ্য হয়।’
ইউক্রেনের মতে, রাশিয়া তাদের শহরগুলোতে যেভাবে হামলা চালিয়েছে, তার ন্যায্য জবাবও এটি।