বাসস
  ২২ জুলাই ২০২৬, ১৩:৩২

ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা 

ঢাকা, ২২ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) :  ডান হাতে অস্ত্রোপচারের ছুরি আলতোভাবে ধরে সার্জন বাতাসে ক্রুশের চিহ্ন আঁকলেন। এরপর অপারেশন টেবিলে অস্ত্রোপচার শুরু করলেন।সময় সকাল ৯টা। ইউক্রেনের দনিপ্রো শহরের কেন্দ্রীয় হাসপাতালে এরই মধ্যে তিনটি অঙ্গচ্ছেদের অস্ত্রোপচার হয়ে গেছে।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

অস্ত্রোপচার টেবিলে ছিলেন ২৭ বছর বয়সী এক সেনা। রুশ ড্রোন হামলায় তার দুই পা ভয়াবহভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক সেরহি রিজহেঙ্কো ও তার চিকিৎসক দল নীরবে অস্ত্রোপচার দেখছিলেন।

পর্যবেক্ষণ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একজন চিকিৎসক ফিসফিস করে বলেন, ‘আমি কখনোই এ দৃশ্যের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারব না।’

২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনজুড়ে আহত সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই হাসপাতাল।হাসপাতালে আহত মানুষের আগমন অব্যাহত থাকলেও, তাদের আঘাতের ধরন বদলে গেছে।

হাসপাতাল পরিচালক রিজহেঙ্কো বলেন, গুলির ক্ষতের জায়গা এখন দখল করেছে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও গ্লাইড বোমার আঘাত। যেগুলো অনেক বেশি ভয়াবহ। তিনি বলেন, ‘শরীর টুকরো টুকরো হয়ে যায়, মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে, হাড় চূর্ণ হয়ে যায়। সবকিছু এমনভাবে ঘটে যে তাদের বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।’

প্রতিদিন সকালে তিনি হাসপাতালের করিডোর ঘুরে দেখেন এবং ৫০টি থেকে ১০০টি অস্ত্রোপচার তদারকি করেন।

একটি দরজা খুলতেই দেখা যায়, এক নারীর মুখে রক্ত লেগে আছে ও তিন জন সেনা দাঁড়িয়ে আছেন। দাগে ভরা মুখের এক আহত সেনাকে চিকিৎসক বলেন, ‘আমরা তোমার সাহসের কথা তোমার কমান্ডারকে জানাব।’

ঘড়ির কাঁটা সকাল ১০টা। সকালের পরিদর্শন শেষ।

‘মাথা থেঁতলে গেছে’-

বিশ্রাম কক্ষে জীবাণুনাশকের গন্ধের সঙ্গে মিশে ছিল রসুন ও কফির গন্ধ। কর্মীরা রুটি ও চেরি খাচ্ছিলেন। হাসপাতালে আসা প্রায় ৮৩ শতাংশ রোগী হয় অচেতন অবস্থায় থাকেন, নয়তো তাদের শরীরের কোনো অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।

চিকিৎসকরা বলেন, প্রতিদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সামলাতে কখনো কখনো তিক্ত রসিকতা তাদের মানসিকভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করে। নার্স রুসলানা ভোরোবিওভা বলেন, ‘একজনের নাড়িভুঁড়ি বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। সে নিজের হাত দিয়ে তা ধরে রেখেছিল।’ তিনি বলেন, ‘আরেকজনের মাথা মাথা থেঁতলে গেছে গিয়েছিল, সবকিছু বেরিয়ে আসছিল।’

২৪ ঘণ্টার দায়িত্বের মাঝে খুব অল্প সময়ের জন্য তারা ক্যাম্প বেডে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঘুমও যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি দেয় না।

ভোরোবিওভা বলেন, ‘আপনি ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন, বিশ্রামের জন্য শুয়ে পড়েন। তারপরও স্বপ্ন দেখেন।’ কথা শেষ না করে তিনি থেমে যান।

‘স্বপ্নে দেখেন, কোথাও বিস্ফোরণ হচ্ছে।’

সম্মুখ যুদ্ধরেখা থেকে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে থাকা শিল্পনগরী দনিপ্রো নিয়মিত রুশ হামলার শিকার হচ্ছে। ভোরোবিওভা বলেন, ‘আমরা দেখি ও জানি এসবের পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে। এ কারণেই বিষয়টি আরও ভয়ংকর মনে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেন বেঁচে আছি, তা বুঝতে পারি’

দুপুরের খাবারের পর প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক ওলগা ফানদেইভা হাসপাতালে অংশে একটি শিশুর জন্ম দেন। পরিবারের সদস্যরা ভিড় করে নবজাতকের ছবি তুলছিলেন এবং তাকে একে অপরের কোলে তুলে দিচ্ছিলেন।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফানদেইভা ট্রমা বিভাগ ও প্রসূতি বিভাগ দুই জায়গাতেই পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বলেন, ‘যখন দেখি তরুণ ছেলেদের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে, আর সকালে এসে এই ছোট্ট হাত-পাগুলো নিজের হাতে নিইÑ তখন যেন নতুন করে সবকিছু অনুভব করি।’

‘তখন বুঝতে পারি, আমি কেন বেঁচে আছি এবং কেন কাজ করছি।’ অনেক সহকর্মী কিছুটা মানসিক স্বস্তি পেতে প্রসূতি বিভাগে চলে আসেন।

অন্যরা বাইরে গিয়ে রোগীদের সঙ্গে বসে ধূমপান করতে করতে কথা বলেন।

বিকেলের হাসপাতাল চত্বরে দুই নার্স বসে গল্প করছিলেন। এক তরুণ সেনা সহযোদ্ধার সঙ্গে হাসছিলেন। তার দাড়ি পুড়ে গেছে এবং একটি পা নেই। তিনি বলেন, ‘সেখানে একজন মানুষ থাকার কথা’

রাত ৮টার দিকে সূর্য ডুবে যায়। ভোরোবিওভার চোখের নিচের কালো দাগ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২২ সাল থেকে এই হাসপাতালে মোট প্রায় ৬০ হাজার অস্ত্রোপচার হয়েছে।

একাধিক গুরুতর আঘাতে আক্রান্ত রোগী এখন নিয়মিত ঘটনা। কারও কারও সপ্তাহে ২০টি পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।

ড্রোন হামলায় আহতদের চিকিৎসা শেখার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর কয়েক ডজন চিকিৎসক ইউক্রেনে এসেছেন। ড্রোন হামলার চিকিৎসা এখন ইউক্রেনের স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুত বিকাশমান একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

মধ্যরাত ঘনিয়ে আসে। শুরু হয় রাতের হামলা।

বুলেটপ্রুফ পোশাক পরা প্যারামেডিকরা এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসে। তার মুখ ব্যান্ডেজে ঢাকা, গলা, চোখ ও মাথায় ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আটকে আছে। রিজহেঙ্কো বলেন, মুখমণ্ডলে আঘাত এখন ক্রমেই বাড়ছে ও এগুলোই ‘আমাদের দেখতে হওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়গুলোর একটি।’

ভোর হওয়ার আগে আরও ছয়টির মতো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে আসে।

কর্মীরা জানান, এটি তুলনামূলক শান্ত রাত ছিল। হাসপাতালের নীল আলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। নতুন রোগীর অপেক্ষার ফাঁকে রিসেপশনিস্ট ঘুমিয়ে পড়েন। চারদিকে কয়েকজনের নাক ডাকার শব্দ শোনা যায়।

সকাল ৮টায় দিনের শিফটের কর্মীরা কাজে যোগ দেন। করিডোরে আবার ব্যস্ততা শুরু হয়। ভোরোবিওভা বাড়ির পথে রওনা হন। সার্জনরা আবার অস্ত্রোপচারের পোশাক পরে নেন।