বাসস
  ১৭ জুলাই ২০২৬, ২৩:২৫

১৯৬৭ সালের ভূমিকম্প থেকে বেঁচে যাওয়া ভেনেজুয়েলানরা এবারের দুর্গতদের পাশে

ঢাকা, ১৭ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : বহু বছর আগে শিশু অবস্থায় ভেনেজুয়েলার এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিলেন মারিয়া এলেনা পায়েজ পুমার। তার কান্নার শব্দ শুনেই উদ্ধারকারীরা তাকে খুঁজে পান এবং উদ্ধার করেন।

সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সময় তিনি ও তার পরিবার প্রায় চার দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন। ঘটনাটি ঘটে ১৯৬৭ সালে দেশটির উত্তর উপকূলীয় লা গুয়াইরা প্রদেশে।

আর গত ২৪ জুন একই এলাকায় শক্তিশালী  জোরা ভূমিকম্প আঘাত হানার পর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পায়েজ পুমার দ্রুত দুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। কারাকাস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অন্যান্য ভেনেজুয়েলাবাসীর সঙ্গে মিলে নিজ দেশের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য অর্থ ও ত্রাণ সংগ্রহে অংশ নেন। কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে তেলসমৃদ্ধ দেশটির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতায় এমনিতেই বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলার জন্য এই দুর্যোগ আরও বড় আঘাত হয়ে আসে।

পায়েজ পুমার বলেন, এমন পরিস্থিতিতে যে-ই থাকুক, যেখান থেকেই হোক, তার সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে।

ভবনগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ায় মৃতের সংখ্যা এখন ৪ হাজার ৮০০ ছাড়িয়েছে। আরও কয়েক হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমি নিজেও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি। পরিবার, বন্ধু এমনকি অচেনা মানুষের কাছ থেকেও অনেক সহায়তা পেয়েছি। তাই এটুকু করা আমার দায়িত্ব।’

বর্তমানে ৫৯ বছর বয়সী পায়েজ পুমার। যখন ১৯৬৭ সালের ২৯ জুলাই উত্তর ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হন তখন তার বয়স ছিল মাত্র সাত মাস।

সে সময় তিনি ও তার পরিবার ভার্গাস শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে সপ্তাহান্ত কাটাচ্ছিলেন। ভূমিকম্পে ভবনটির ওপরের তলাগুলো ধসে পড়ে এবং তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন।

পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে জানান, তার কান্নার শব্দই উদ্ধারকারীদের তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে সাহায্য করেছিল।

তিনি বলেন, ‘আমার কান্নার কারণেই উদ্ধারকারীরা প্রথমে আমার মায়ের কাছে, তারপর আমার ভাইবোনদের কাছে এবং শেষে আমার কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন।’

তার এক ভাই মারা যান। তবে দীর্ঘ ও কঠিন উদ্ধার অভিযানের পর ভূমিকম্পের প্রায় চার দিন পর উদ্ধারকারীরা তার মা, বোন এবং তাকে জীবিত উদ্ধার করেন।

তারা বেঁচে গেলেও সেই দুর্ঘটনার গভীর ক্ষত আজও বহন করছেন।

ঘটনার দিন তার বোনের বয়স প্রায় তিন বছর হতে চলেছিল। উদ্ধার অভিযানের সময় তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। পরে গ্যাংগ্রিন ছড়িয়ে পড়ায় দুই পায়ই কেটে ফেলতে হয়।

অন্যদিকে পায়েজ পুমার যে খাটে শুয়ে ছিলেন, সেটি তার শরীরের ওপর ভেঙে পড়ে। এতে তার ডান হাতের কনুইয়ের নিচের অংশ কেটে ফেলতে হয়।

তার মা শারীরিকভাবে অক্ষত থাকলেও হাত স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে আবার সক্ষম হতে তার দেড় বছর সময় লেগেছিল।

তিনি বলেন, এসব সংগ্রাম তাকে ঈশ্বরে দৃঢ় বিশ্বাসী, শৃঙ্খলাপরায়ণ, নিখুঁতভাবে কাজ করতে অভ্যস্ত এবং মানসিকভাবে শক্ত একজন মানুষে পরিণত করেছে।

তার ভাষায়, ‘আমি এমনভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছি, যাতে আমার শারীরিক অক্ষমতা আর অক্ষমতা না থেকে বরং জীবনের সব কাজ করার শক্তিতে পরিণত হয়।’

ভেনেজুয়েলায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করার পর ১১ বছর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় স্থায়ী হন। বর্তমানে তিনি শিক্ষকতা করছেন।

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে আহত তরুণদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, শারীরিক ও মানসিক ক্ষত কাটিয়ে উঠতে ধৈর্য ধরতে হবে।