শিরোনাম

ঢাকা, ১৩ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। একই সময়ে ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় কয়েকটি মিত্র দেশও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
সর্বশেষ এ সংঘাত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিকে নতুন করে দুর্বল করে দিয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এর প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরণের ধাক্কা লেগেছে।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক্সে জানায়, রোববার রাত ২১০০ জিএমটি থেকে সর্বশেষ হামলা শুরু হয়। এর আগের রাতে প্রায় ১৪০টি হামলা চালানো হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ও পশ্চিম ইরানের বিস্তীর্ণ এলাকায় হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালীর কাছে কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং ইরাক সীমান্তবর্তী খুজিস্তান প্রদেশও রয়েছে।
চুক্তি ঘোষণার পর থেকে তেলের দাম কমছিল। তবে সোমবার টোকিওতে ফিউচার লেনদেন শুরু হলে তেলের দাম সাড়ে ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৪ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
ইরান জানায়, রোববার সন্ধ্যায় তাদের দক্ষিণাঞ্চলের দুটি দ্বীপেও হামলা হয়েছে।
অন্যদিকে কুয়েত জানায়, সীমান্ত চৌকি এবং একটি অফশোর তেল প্ল্যাটফর্মে হামলা হয়েছে। এর আগে তেহরান একাধিকবার কুয়েতে থাকা মার্কিন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে।
নতুন করে এ সংঘাতের সূচনা হয় রোববার ভোরে হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পর। আগুন ধরে যাওয়ায় জাহাজটির নাবিকরা সেটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।
কৌশলগত এ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার একজন উপদেষ্টা রোববার বলেন, এটি ‘ডজনখানেক পারমাণবিক বোমার’ চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধান টিকিয়ে রাখতে মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রোববারের মার্কিন হামলা ‘হরমুজ প্রণালীতে আবারও অনিরাপত্তা সৃষ্টি করেছে’ এবং ‘এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।’
-কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি-
রোববার সন্ধ্যায় ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, কেশম দ্বীপে অন্তত ১০টি ‘শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র’ আঘাত হেনেছে।
তারা আরও জানায়, কেশমের পূর্বে উপসাগরীয় ফারুর দ্বীপে হামলায় একজন টেলিযোগাযোগ কর্মী নিহত ও আরও দুজন আহত হয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা সোমবার ভোরে জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মাহশাহরের একটি পানি পাম্পিং স্টেশনে মার্কিন হামলায় একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন।
রোববার কুয়েত জানায়, দেশটির উত্তরাঞ্চলের তিনটি স্থল সীমান্ত চৌকি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া একটি অফশোর তেল খনন প্ল্যাটফর্ম ‘শত্রুপক্ষের একটি ড্রোনের’ লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে একজন আহত হয়েছেন।
তেহরান জানায়, রোববার ভোরে তারা হরমুজে দুটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজে আগুন ধরে যায়।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এর জবাবে তারা প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইরানের গণমাধ্যম বন্দর আব্বাস, সিরিক, জাস্ক, কেশম এবং খুজিস্তান প্রদেশে বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। এতে একজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। এএফপির সাংবাদিক ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে সাইরেন বেজে ওঠে এবং বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
কুয়েত জানায়, তারা হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। জর্ডান জানায়, ইরানের তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির ভেতরে এসে পড়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড জানায়, তারা ওমানেও হামলা চালিয়েছে। দেশটি খুব কমই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়।
ওমানের রাজধানী মাসকাট ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা দেশটির জন্য এটি একটি বিরল পদক্ষেপ।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আতিথ্য দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ হামলার ঘটনা ঘটে।
নয়াদিল্লি জানায়, রোববার হরমুজ প্রণালীতে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজে হামলার ঘটনায় একজন ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ হয়েছেন।
অন্যদিকে মাসকাট জানায়, তারা একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ২৩ জন নাবিককে উদ্ধার করেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুদ্ধের প্রথম দিন তার বাবা ও পূর্বসূরি নিহত হওয়ার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, যাদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে ইরান তাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শনিবার বলেন, তাকে হত্যার কোনো চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেবে।’
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিক ইসহাক দার রোববার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেনবলে ইসলামাবাদ জানিয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, ‘সংলাপ ও কূটনীতিই বিরোধ নিষ্পত্তি এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র কার্যকর পথ।’
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন। তার মুখপাত্র বলেন, ‘এই হামলা অবশ্যই বন্ধ হতে হবে।’