বাসস
  ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৭:০৮

খামেনির দাফনের আগে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

ঢাকা, ৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির দাফনের প্রস্তুতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরানে কয়েকজন নিহত হয়েছেন।

ইরান জানিয়েছে, তারা কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় আবারও হামলা শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা থেকে পুনরায় শুরু হওয়া এ সংঘাত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কয়েক দশকের বৈরী দুই দেশ পরস্পরের ওপর হামলা চালায়। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দিনের মার্কিন হামলায় ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন।

এদিকে ইরান দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনেই খামেনি তার পরিবারের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সদস্যসহ নিহত হন।

ছয় দিনব্যাপী শেষকৃত্য কর্মসূচির শেষ দিনে বৃহস্পতিবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর ও তার জন্মস্থান মাশহাদে খামেনিকে দাফন করা হবে। সেখানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর জনসমক্ষে এখনো না আসা তার ছেলে মোজতবা খামেনির উপস্থিতি থাকে কি না, সেদিকে সবার নজর থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র ‘অমানবিক’ ও ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’: ইরান

মাশহাদ থেকে এএফপি জানায়, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, মার্কিন হামলায় রেলসেতুসহ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এসব হামলাকে তারা ‘জঘন্য যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রশাসনকে ‘অমানবিক ও মানসিক বিকারগ্রস্ত’ উল্লেখ করে ‘অশালীনতা, মিথ্যাচার ও সামরিক আগ্রাসনের’ অভিযোগ আনা হয়।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে জানা যায়, সর্বশেষ হামলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আহভাজ শহরের উপকণ্ঠে তিনজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবারের অভিযানে ইরানের প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার।

অন্যদিকে ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা ড্রোন ব্যবহার করে কুয়েতে একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কাতারের একটি আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং বাহরাইনের জ্বালানি সংরক্ষণাগারে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের অংশ বলে তারা জানিয়েছে।

এর আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি করে।

এএফপির এক সংবাদদাতা জানান, বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বৃহস্পতিবার সকালে তৃতীয়বারের মতো বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানোর সময় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই রাতের বেলায় ইরান হামলা চালিয়েছিল।

যুদ্ধবিমান পাহারায় মাশহাদে খামেনির কফিন

আইআরজিসি অভিযোগ করেছে, খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকে আড়াল করতেই যুক্তরাষ্ট্র রেলসেতুতে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

তেহরান, কুম এবং ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় পাঁচ দিনের শেষকৃত্য শেষে খামেনির কফিনবাহী বিমান বৃহস্পতিবার সকালে মাশহাদে পৌঁছায়।

সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ইরান শাসনকারী খামেনির শেষকৃত্য নতুন নেতৃত্বের ঐক্য প্রদর্শনের সুযোগ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব একসঙ্গে থাকার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে তিনি কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির বিমান হামলায় তিনিও আহত হন।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে খামেনির কফিনবাহী বিমানকে অন্তত একটি যুদ্ধবিমান পাহারা দিয়ে মাশহাদে নিয়ে যায় বলে সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরের প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে।

যুদ্ধবিরতি ‘অত্যন্ত নাজুক’

বুধবার হামলা-পাল্টা হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ হয়ে গেছে’। তবে তিনি আলোচনার পথও খোলা রাখেন এবং বলেন, যেকোনো সামরিক অভিযান দ্রুত শেষ হবে।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি এখনো বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার আগে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও এখন ইরান এ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে।

বুধবার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান কিছুক্ষণ আগে যোগাযোগ করেছে এবং তারা ‘খুবই আগ্রহের সঙ্গে একটি সমঝোতা করতে চায়’। একই সঙ্গে তিনি ইরানিদের ‘কিছুটা উন্মাদ’ বলেও মন্তব্য করেন।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বৃহস্পতিবার বলেন, 'হরমুজ প্রণালূ কেবল ইরানের নির্ধারিত ব্যবস্থাপনার অধীনেই খুলে দেওয়া হবে।'

তিনি এক্সে লেখেন, 'যুক্তরাষ্ট্র এখনো শেখেনি যে ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরিণতি আছে। স্পষ্ট করে বলছি—আপনারা হামলা করলে, পাল্টা হামলার মুখে পড়বেন।'

গত কয়েক দিনে ইরান অন্তত তিনটি জাহাজে হামলা চালানোর পর মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক আকারে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।

গত মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল।

তবে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর)-এর বিশ্লেষক এলি জেরানমায়ে বলেন, গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ‘অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে’, কারণ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এটিই দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘর্ষ।

তার মতে, 'তবু তেহরান ও ওয়াশিংটনের সামনে কূটনৈতিক পথ ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প নেই, আর সেই পথই এমওইউয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।'