বাসস
  ০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:২৫
আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ১৩:৩৫

সুপার টাইফুন ‘বাভি’র আঘাতে মার্কিন দ্বীপপুঞ্জে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

ঢাকা, ৬ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ক্যাটাগরি-৫ হারিকেনের সমান শক্তিশালী সুপার টাইফুন ‘বাভি’ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ ও গুয়ামে আঘাত হেনেছে। এতে ছোট দ্বীপ রোটায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

মার্কিন জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা (এনডব্লিউএস) জানায়, সুপার টাইফুন বাভির কেন্দ্র বা ‘চোখ’ পুরো রোটা দ্বীপের ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে। এ সময় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৯০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হয়। এরপর এটি খুব ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরে যেতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

তবে দুপুর পর্যন্তও দ্বীপপুঞ্জজুড়ে প্রবল বাতাস ও মুষলধারে বৃষ্টি চলতে থাকে। এতে বাসিন্দারা ঘরের ভেতরেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

সোমবার ভোরে ঝড়টি আঘাত হানার সময় এনডব্লিউএস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রোটার প্রায় ১ হাজার ৫০০ বাসিন্দাকে সতর্ক করে জানায়, ‘এই ভয়াবহ বাতাসকে টর্নেডো আসার মতোই বিপজ্জনক মনে করুন। 

এখনই ঘরের ভেতরের নিরাপদ কক্ষ বা আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান।’

গুয়াম থেকে ৮০ কিলোমিটারেরও কম উত্তরে অবস্থিত নর্দার্ন মারিয়ানার দক্ষিণতম দ্বীপ রোটার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত থাকায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।

রোটা মিউনিসিপ্যাল অপারেশনস সেন্টারের জনসংযোগ কর্মকর্তা লু রোজারিও বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখানে প্রবল বাতাস ও বন্যা চলছে। অনেকেই ইতোমধ্যে বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতির খবর জানিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, একটি মোবাইল ফোন টাওয়ার ভেঙে পড়ায় কিছু এলাকায় মোবাইল ফোন সেবা বন্ধ হয়ে গেছে।

এর আগে এনডব্লিউএস সতর্ক করে, টাইফুনটি সরাসরি রোটায় আঘাত হানলে দ্বীপটির বেশির ভাগ এলাকা কয়েক সপ্তাহ, এমনকি তারও বেশি সময় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। প্রায় সব গাছ ভেঙে যাবে। 

আর কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে।

এনডব্লিউএসের আবহাওয়াবিদ মার্কাস ল্যান্ডন আইডলেট ফেসবুক লাইভে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, টিনিয়ান, গুয়ামের উত্তরাঞ্চল এবং সাইপানের দক্ষিণ প্রান্তে ক্যাটাগরি-১ হারিকেনের সমতুল্য বাতাস বয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘সুপার টাইফুন বাভি এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

নর্দার্ন মারিয়ানা এবং পার্শ্ববর্তী পৃথক মার্কিন অঞ্চল গুয়ামে মোট প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার মানুষের বসবাস।

গুয়াম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দ্বীপটিতে ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

এনডব্লিউএস জানায়, বিকেল পর্যন্ত ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার  বেগে বাতাস এবং ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার বেগের দমকা হাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে।

সংস্থাটি বলেছে, ‘বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়েই থাকতে হবে। এটি এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং প্রাণঘাতী পরিস্থিতি।’

টিনিয়ানের ৫৬ বছর বয়সী স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্মী এডউইন সান্তা থেরেসা বলেন, স্থানীয়রা ঝড় মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে জ্বালানি। কারণ এর সরবরাহ সীমিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘এপ্রিলের আগের টাইফুনের পর মাত্র চার দিন আগে আমার বাড়িতে বিদ্যুৎ ফিরেছিল। 

এখন আবার সেটি চলে গেছে। আশা করছি, এই টাইফুন চলে যাওয়ার পর দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে।’

নর্দার্ন মারিয়ানার প্রধান দ্বীপ সাইপানের ৬১ বছর বয়সী বাসিন্দা রোয়েল মারিয়ানো বলেন, এপ্রিলের ঝড়টি তার কাছে আরও ভয়াবহ ছিল।

তিনি বলেন, ‘সুপার টাইফুন সিনলাকু আরও শক্তিশালী ছিল। কারণ, ঝড়টির কেন্দ্র সরাসরি সাইপানের ওপর দিয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘সিনলাকুর সময় প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে আমাদের বাড়ি প্লাবিত হয়েছিল। ঘরের ছাদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য ছিল খুবই ভয়াবহ।’

২০২৩ সালে ‘মাওয়ার’ নামে আরও একটি শক্তিশালী ঝড় এ অঞ্চলে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করেছিল।

আশ্রয়কেন্দ্রে কয়েক শত মানুষ-

প্রবল বাতাসে জানালা কাঁপতে থাকায় এবং বৃষ্টির পানি কক্ষ ও সিঁড়িঘরে ঢুকে পড়ায় গুয়াম প্লাজা হোটেলে কয়েকশ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

হোটেলটির প্রায় ৭০ শতাংশ অতিথিই স্থানীয় বাসিন্দা। ঝড় কেটে না যাওয়া পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করছেন। এপ্রিলে হোটেলটি বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ৮ লাখ ডলার ব্যয়ে একটি ব্যাকআপ জেনারেটর স্থাপন করে।

হোটেলটির ৫৯ বছর বয়সী মহাব্যবস্থাপক সুদীপ্ত বসু এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের হোটেল স্থানীয় মালিকানাধীন। তাই আমরা স্থানীয় গ্রাহকদেরই সেবা দিই। তাদের জন্য এখানে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করছি।’

রোববার বিকেল থেকেই গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানার সড়কগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। শুধু পুলিশি টহল এবং বিশাল ঢেউ উপভোগ শেষে ফিরে আসা কয়েকজন সার্ফারকে দেখা যায়। প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ ছিল। অনেক দোকানের জানালায় প্লাইউড লাগিয়ে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল।

গুয়ামের ৫৫ বছর বয়সী পিঙ্কি কিউবাকাব জানান, নিজের খাবারের দোকান রক্ষায় তিনি একটি কাঠের দোকান থেকে ৫০০ ডলারের প্লাইউড কিনেছেন।

তিনি বলেন, ‘এত দিন ব্যবসা বন্ধ রাখার সামর্থ্য আমার নেই। এতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’

এল নিনো নিয়ে উদ্বেগ-

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস মেরিন সার্ভিস গত বুধবার জানিয়েছে, বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে রেকর্ড উষ্ণতম জুন মাস পার হয়েছে। সামনের মাসগুলোতে নতুন রেকর্ডও গড়তে পারে।

উষ্ণ সমুদ্রের পানি ক্রান্তীয় ঝড়কে আরও শক্তিশালী হতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে এটি বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা বাড়ায়, যা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণ হতে পারে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) শুক্রবার জানায়, দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেওয়া এবং সাধারণত ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা ‘এল নিনো’ ইতোমধ্যে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে শুরু হয়েছে। এটি শক্তিশালী হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।

এই প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনার কারণে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন আসে।

এনডব্লিউএসের আবহাওয়াবিদ আইডলেট বলেন, ‘এ বছর এল নিনো থাকায় আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল গত পাঁচ-ছয় বছরের তুলনায় এবার ঝড়ের মৌসুম অনেক বেশি সক্রিয় হতে পারে।