বাসস
  ২৫ জুন ২০২৬, ১৬:১৮

‘মাস্টার কি’ প্রযুক্তির টিকা ভবিষ্যৎ মহামারি ঠেকাতে পারে: গবেষকরা

ঢাকা, ২৫ জুন, ২০২৬ (বাসস) : কোভিড, সার্স কিংবা ইবোলার মতো ভাইরাসগুলোর নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে সুরক্ষা পোশাক পরা স্বাস্থ্যকর্মীদের ছবি। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়।

প্রতিটি ভাইরাসের জন্য আলাদা টিকা কিছুটা সুরক্ষা দিলেও, নতুন নতুন ধরণ বা ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

এ অবস্থায় ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)’র সহায়তায় নতুন এক টিকা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। গবেষকদের মতে, এটি ভাইরাসের পুরো একটি পরিবারের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতের মহামারি প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্যামব্রিজ থেকে বার্তা সংস্থা এ খবর জানিয়েছে।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন হিনি এই প্রযুক্তিকে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ‘মাস্টার কি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তিনি বলেন, বর্তমান টিকাগুলোর প্রধান সমস্যা হলো এগুলো অতীতের কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাস ধরণকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়। ফলে যে ধরণের বিরুদ্ধে টিকা নেওয়া হয়েছে, ছয় মাস পর হয়তো মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের ভাইরাসের সংস্পর্শে আসতে পারে।

এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রকল্পটির প্রধান গবেষক হিনি বলেন, ‘টিকা সব সময় ভাইরাসের পেছনে ছুটে বেড়ায়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এই পরিবর্তনশীলতা দূর করার চেষ্টা করছি। এমন কিছু তৈরি করছি, যা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে সব ধরণের রূপেই পরিচিত হবে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সুরক্ষা দেবে।’

একে একটি বড় ধরণের ধারণাগত পরিবর্তন বলে উল্লেখ করেন হিনি।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগের ভাইরাল জুনোটিকস ল্যাবরেটরির গবেষক, কানাডীয় বংশোদ্ভূত হিনি ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা প্রাদুর্ভাবের পর এ প্রকল্পে কাজ শুরু করেন। 

সে সময় তিনি ওই অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন।

-ঘোড়া তখন ছুটে গেছে’-

এর আগে, ইবোলা মূলত মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে দেখা গেলেও পশ্চিম আফ্রিকায় এর প্রাদুর্ভাব ছিল নতুন। শুরুতে রোগটিকে লাসা জ্বর, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস বা কলেরা হিসেবে ভুল শনাক্ত করা হয়েছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম আফ্রিকার ওই প্রাদুর্ভাবে শেষ পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়।

হিনি বলেন, রোগটি কী, তা শনাক্ত করতেই তিন থেকে চার মাস সময় লেগে যায়। ফলে টিকা তৈরির কাজ শুরু করাও বিলম্বিত হয়।

তিনি বলেন, ‘এই সময়ের মধ্যেই এটি দ্রুত গিনি, সিয়েরা লিওন ও লাইবেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।’ 

তিনি জানান, মৃতদের মধ্যে অনেক স্বাস্থ্যকর্মীও ছিলেন।

পশ্চিম আফ্রিকার প্রাদুর্ভাব শেষে ক্যামব্রিজে ফিরে এসে তাদের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে, ‘আমাদের এই পদ্ধতি বদলাতেই হবে। একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যাবে না।’

তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তির প্রাথমিক সংস্করণ ব্যবহার করে তার দল বিভিন্ন ভাইরাস সম্পর্কিত যত তথ্য পাওয়া গেছে, সব একত্র করে বিশ্লেষণ করেছে।

এর মাধ্যমে তারা ভাইরাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর মিল ও অমিল শনাক্ত করতে সক্ষম হন, যেগুলোর প্রতি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সাড়া দেয়। ফলে শুধু একটি ভ্যারিয়েন্ট নয়, বরং সব ধরণের ভ্যারিয়েন্টকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

হিনির মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের চলাচল বৃদ্ধি ও মানুষের কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার ফলে নতুন ভাইরাসের আবির্ভাব এখন আরও ঘন ঘন ঘটছে। এ কারণে নতুন প্রযুক্তিটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, আগে যেসব ভাইরাস প্রাণীদের মধ্যে নিরীহভাবে অবস্থান করত ও যেসব প্রাণী সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, সেসব ভাইরাস এখন মানুষের সংস্পর্শে আসছে। ‘আর তখন দেখা যাচ্ছে  যে মানুষের কোনো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই, কোনো প্রাকৃতিক সুরক্ষা নেই। ফলে ভাইরাস ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে।’ 

-‘ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে’-

‘সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটি হসপিটাল’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ৩৯ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর একটি পরীক্ষায় এআই-সহায়তায় তৈরি সার্বজনীন সারবেকো করোনাভাইরাস টিকার ক্ষেত্রে ‘নিরাপত্তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্বেগ’ পাওয়া যায়নি।

সংক্রামক রোগ ক্ষেত্রের মাসিক পিয়ার-রিভিউড মেডিকেল জার্নাল ‘জার্নাল অব ইনফেকশন’-এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

ক্যামব্রিজের বিজ্ঞানী ও বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান ডায়োসিনভ্যাক্সের যৌথ উদ্যোগে তৈরি টিকাটি এখন আরও বৃহৎ পরিসরের পরীক্ষার দিকে এগোচ্ছে।

হিনি বলেন, মানব ইতিহাসে বহুবার মহামারি দেখা গেছে। মধ্যযুগের ব্ল্যাক ডেথ থেকে শুরু করে ১৯১৮-২০ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি পর্যন্ত, যাতে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৫ কোটি মানুষ মারা যায়।

তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সম্ভাব্য ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি। 

তিনি এটিকে সবচেয়ে ‘জটিল’ ভাইরাসগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন।

তবে তিনি আশাবাদী, নতুন এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরেকটি প্রাণঘাতী মহামারি ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এখন এআই-এর সম্পূর্ণ নতুন একটি স্তর তৈরি হয়েছে। সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের একটি দল আরও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলছে, যাতে আমরা আরও দ্রুত ও অধিকতর তথ্য নিয়ে কাজ করতে পারি।’

হিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, এটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রযুক্তির দুয়ার খুলে দিচ্ছে। আশা করি, এটি ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারবে।’