বাসস
  ২৪ জুন ২০২৬, ২০:৩৯

চীনের ‘সামার দাভোস’-এ আলোচনার কেন্দ্রে ভূরাজনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ২৪ জুন, ২০২৬ (বাসস) : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)সহ নতুন প্রযুক্তির অগ্রগতিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা হলেও কর্মসংস্থান সংকটের আশঙ্কা এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। চীনের ‘সামার দাভোস’ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বক্তারা এএফপিকে এ কথা বলেছেন।

সুইজারল্যান্ড-ভিত্তিক ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত বার্ষিক এ সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন।

চীনের দালিয়ান থেকে এএফপি জানায়, ডব্লিউইএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরেক দুসেক মঙ্গলবার বলেন, ‘এআই সত্যিই শিল্প ও অর্থনীতিকে বদলে দিচ্ছে।’ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আশীর্বাদ পেয়েছি। তবে বিশ্বের সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো-কীভাবে নিশ্চিত করা যায় যে এসব প্রযুক্তি বাস্তব অর্থনীতিতে কার্যকর অবদান রাখছে।’

তবে এসব প্রযুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের কারণে শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং সাইবার নিরাপত্তা ভঙ্গ থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহারের মতো ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়েছে।

‘মন্থর’ বৈশ্বিক অর্থনীতি

এসব অনিশ্চয়তার কারণে বিশ^ব্যাংক চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে কোভিড-১৯ মহামারির পর সর্বনি¤œ পর্যায়ে নামিয়েছে।

দুসেক বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে একটি মন্থর পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি বিশ্ব গুরুতর বিভাজনের দিকে এগোয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুযোগ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।’

বুধবার সকালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং ডব্লিউইএফের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এ বছর সম্মেলনটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী দালিয়ানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এ সম্মেলনকে চীনের অর্থনীতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও ব্যবসায়ী নেতাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগের দশকগুলোর দ্রুত প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

রপ্তানি ও এআই প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও দুর্বল অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী আবাসন খাতের ঋণসংকট মহামারির পর থেকে প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাতের আশঙ্কা

চীনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

হার্ভার্ড কেনেডজ স্কুলের অধ্যাপক গ্রাহাম অ্যালিসন এএফপিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি এখনও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ ধারণার প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত অ্যালিসন বলেন, চীনের মতো দ্রুত উত্থানশীল কোনো শক্তি যখন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিদ্যমান প্রভাবশালী শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস এ ধরনের পরিস্থিতিতে ‘স্বাভাবিক কূটনীতি ও স্বাভাবিক রাষ্ট্রনীতি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ ডেকে আনে’ বলে সতর্ক করেছিলেন, উল্লেখ করেন তিনি।

তবে সম্প্রতি দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ সংঘাত এড়ানোর বিষয়ে আশাবাদ তৈরি করেছে বলেও জানান অ্যালিসন।

গত মাসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছিলেন, দুই দেশ কি ‘থুসিডিদিস ফাঁদ’ অতিক্রম করে বৃহৎ শক্তিগুলোর সম্পর্কের নতুন ধারা তৈরি করতে পারে না?

অ্যালিসনের মতে, শি জিনপিং সচেতনভাবেই এ ঐতিহাসিক ধারণার উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, ট্রাম্পের নিজস্ব অনিশ্চিত রাজনৈতিক আচরণ থাকলেও তিনি বুঝতে পেরেছেন যে চীন একটি ভিন্ন ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি।

অ্যালিসনের ভাষায়, ওয়াশিংটনের উচ্চ শুল্কের জবাবে চীনের বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ ট্রাম্পকে বুঝতে সাহায্য করেছে যে তিনি এখন প্রায় সমমর্যাদার একটি শক্তির মুখোমুখি।

তিনি বলেন, ‘দুই প্রেসিডেন্টই স্পষ্টত এমন একটি নতুন কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, যা থুসিডাইডিস ফাঁদ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হবে।’