শিরোনাম

ঢাকা, ২৪ জুন, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রস্তাব পাস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট। তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হোয়াইট হাউসের জন্য এটি নতুন এক রাজনৈতিক ভর্ৎসনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, মঙ্গলবার সিনেটে ৫০-৪৮ ভোটে গৃহীত প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে, কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক অভিযানের অনুমোদন না দিলে ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে।
প্রস্তাবটি ‘কনকারেন্ট রেজল্যুশন’ হওয়ায় তা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য হোয়াইট হাউসে পাঠানো হবে না। ফলে এর আইনগত কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
তবে এর মাধ্যমে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই যুদ্ধের বিরোধিতা করল, যা গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। এ সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে জড়িয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও ২০১৯ ও ২০২০ সালে যথাক্রমে ইয়েমেন ও ইরানসংক্রান্ত সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে ‘ওয়ার পাওয়ারস’ বিল পাস করেছিল কংগ্রেস। তবে ট্রাম্প সেগুলোতে ভেটো দেন এবং সিনেট সেই ভেটো অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়।
মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ভোটাভুটির সমালোচনা করে একে ‘ভুল সময়ে নেওয়া অর্থহীন সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যা দেন।
তিনি লেখেন, ‘এই সিনেটররা আমার কাজ আরও কঠিন করে তুলেছেন। কিন্তু আমি যেভাবেই হোক কাজটি সম্পন্ন করব, কারণ আমি সবসময়ই তা করে থাকি।’
এই ভোট এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতা স্মারককে চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ দেওয়ার জন্য ৬০ দিনের কূটনৈতিক উদ্যোগ চালাচ্ছে। আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ভোটাভুটির উদ্যোগ নেন। ট্রাম্পের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মিত্র যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর তিনি রিপাবলিকানদের অবস্থান প্রকাশ্যে আনতে এই পদক্ষেপ নেন।
ভোটের আগে দেওয়া বক্তব্যে শুমার বলেন, ‘রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের যুদ্ধ, গোপনীয়তা এবং ইরান-সংক্রান্ত বিপর্যয়কর চুক্তি নিয়ে বন্ধ কক্ষের ভেতরে যত খুশি সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু এই যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে তাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
এর আগে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদেও প্রস্তাবটি পাস হয়। সেখানে চারজন রিপাবলিকান সদস্য সব ডেমোক্র্যাট সদস্যের সঙ্গে একযোগে এর পক্ষে ভোট দেন, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিরল অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে ট্রাম্প সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।
‘বিপজ্জনক সম্ভাবনা’
১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, কোনো প্রেসিডেন্ট মার্কিন বাহিনীকে যুদ্ধে জড়ালে ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। যদিও উভয় দলের প্রশাসনই বিভিন্ন সময়ে এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা অসাংবিধানিক। তাদের মতে, ট্রাম্প ঘোষিত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাত ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
প্রশাসন আরও বলেছে, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করলে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ও ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মাইক জনসন ভোটের আগে বলেন, আলোচনার সময় সেনাপ্রধানের ক্ষমতা সীমিত করা ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক সম্ভাবনা’।
তবে ডেমোক্র্যাট ও কিছু রিপাবলিকান সদস্যের মতে, সংঘাত আইনি সময়সীমার অনেক পর পর্যন্ত চলেছে এবং ট্রাম্প বারবার নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও কংগ্রেসে উদ্বেগ বাড়ছে। এ সংঘাত বাণিজ্যপথে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন মার্কিন ভোটারদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর থেকে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা দ্রুত এগিয়েছে। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা।
তবে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
মঙ্গলবার ইরান জানায়, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থাকে দেওয়া হবে না। এর মাধ্যমে তারা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন তেহরান পরিদর্শকদের ফিরতে সম্মত হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ইরান ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ের’ পারমাণবিক পরিদর্শন মেনে নিয়েছে।
এদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালীতে যে অবাধ নৌযান চলাচল ছিল, তা ‘আর কখনোই ফিরবে না’। যদিও প্রণালিটি সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে নতুন যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।