বাসস
  ২২ জুন ২০২৬, ১৯:১৫

অজনপ্রিয়তার ভারে পদত্যাগ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের

ঢাকা, ২২ জুন, ২০২৬ (বাসস): ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের ক্ষমতায় এসে মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টিকে বিপুল বিজয় এনে দিয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথেষ্ট সম্মান কুড়ানোর পরও মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নিজ দেশে কয়েক দশকের সবচেয়ে অজনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদ ছাড়তে হচ্ছে তাকে।

লন্ডন থেকে এএফপি জানায়, গম্ভীর মুখে সোমবার ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে স্টারমার তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল ‘তার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত’, তবে এখন ‘মর্যাদার সঙ্গে’ বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে।

আবেগঘন মুহূর্তে পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তার চোখে জল চলে আসে। পরে স্ত্রীকে আলিঙ্গন করে তিনি সেখান থেকে চলে যান।

২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি ১৪ বছরের লেবার পার্টি-বিরোধী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস-এর মাত্র ৪৯ দিনের সরকারসহ ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দলীয় কোন্দলের পর তিনি স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে স্টারমার, বর্তমানে ৬৩ বছর বয়সী, ‘সেবামূলক’ সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেন, যা মানুষের জীবনে ‘কম হস্তক্ষেপ’ করবে।

নিজের বাস্তববাদী ও প্রশাসনিক শৈলীকে তিনি সাবেক কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রীদের আদর্শিক ও আড়ম্বরপূর্ণ রাজনীতির বিপরীতে তুলে ধরেন। বিশেষ করে বরিস জনসনের সঙ্গে নিজের পার্থক্য তুলে ধরেন তিনি।

কিন্তু একের পর এক নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে শুরু থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েন স্টারমার। এতে লেবার পার্টির সমর্থকরাও ক্ষুব্ধ হন। মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জনকারী স্টারমার শেষ পর্যন্ত সেই নির্ভরযোগ্য নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেননি, যা তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

সম্ভাব্য উত্তরসূরি অ্যান্ডি বার্নহ্যাম

স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন সাবেক অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র বার্নহ্যাম গত সপ্তাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার পার্লামেন্টে ফিরেছেন।

যেখানে স্টারমারকে অনেকের কাছে কাঠখোট্টা ও দূরত্ব বজায় রাখা নেতা মনে হয়েছে, সেখানে বার্নহ্যামকে বেশি প্রাণবন্ত ও জনসংযোগে দক্ষ বলে বিবেচনা করা হয়।

বিদায় ঘোষণার সময় স্টারমার দাবি করেন, তিনি যুক্তরাজ্যকে ‘আরও শক্তিশালী ও ন্যায়সঙ্গত’ অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন। তবে জনমত জরিপ সংস্থা ইউগভের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তার হার ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ, যা ইতিহাসের অন্যতম নিম্ন হার।

মানবাধিকার আইনজীবী থেকে প্রধানমন্ত্রী

১৯৬২ সালের ২ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উপকণ্ঠে জন্ম নেওয়া স্টারমারের শৈশব কেটেছে একটি ছোট আধা-সংযুক্ত বাড়িতে। তার মা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন এবং বাবা ছিলেন কিছুটা সংসারবিমুখ; তিনি প্রাণী ভালোবাসতেন এবং পরিত্যক্ত গাধা উদ্ধার করতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে স্টারমার মানবাধিকার আইনজীবী ও পরে রাষ্ট্রের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে সফল কর্মজীবন গড়ে তোলেন। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এিেলজাবেথ তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।

বাঁশিবাদক ও আরসেনালের একনিষ্ঠ সমর্থক স্টারমার ২০১৫ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২০ সালে দলের ভয়াবহ নির্বাচনী পরাজয়ের পর তিনি জেরেমি করবিন-এর স্থলাভিষিক্ত হয়ে লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

দলের ভেতরে ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী অবস্থান গ্রহণ, করবিনপন্থীদের সরিয়ে দেওয়া এবং দলকে মধ্যপন্থায় ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে তিনি ২০২৪ সালে দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে লেবারের সবচেয়ে বড় বিজয় এনে দেন।

তবে করবিনপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং অভিবাসন প্রশ্নে তার সরকারের নীতির কারণে দলের বামপন্থী অংশের বিরাগভাজন হন তিনি।

এপস্টেইন বিতর্ক ও রাজনৈতিক পতন

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তিনি প্রবীণদের জন্য শীতকালীন জ্বালানি ভাতা বাতিলের ঘোষণা দেন, যা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে তাকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়।

এ ছাড়া কল্যাণভাতা সংস্কার, কৃষকদের জন্য উত্তরাধিকার কর আরোপের পরিকল্পনা প্রত্যাহার এবং বেতন কর ও ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ী মহলেও অসন্তোষ সৃষ্টি করে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার সম্পত্তি কর কম দেওয়ার অভিযোগে পদত্যাগ করেন।

একই মাসে স্টারমার ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করেন। প্রয়াত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের  সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

স্টারমার পরে এ নিয়োগের জন্য ক্ষমা চান। কিন্তু এ ঘটনাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয় এবং তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকেও বিদায় নিতে হয়।

এরপর মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের ভরাডুবি তার পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো করে তোলে।

তবে সমর্থকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর বিরোধিতা করা, ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় সমর্থন বজায় রাখা এবং ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ ছিল তার উল্লেখযোগ্য অর্জন।

নিজের বিদায়ী বক্তব্যেও তিনি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমে আসার মতো সাফল্যের কথা তুলে ধরেন।

তবে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের অনেক বিশ্লেষক তাকে এমন এক নেতা হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যার নিজস্ব দৃঢ় আদর্শ ছিল না, যিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন এবং প্রয়োজন হলে সহযোগীদেরও বলি দিতে প্রস্তুত ছিলেন।