বাসস
  ১৭ মে ২০২৬, ১২:৫৮

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়লেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের ব্যাপক হামলা

ঢাকা, ১৭ মে, ২০২৬ (বাসস) : যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর একদিন পরই দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। শনিবার দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হামলা হয়।

বৈরুত থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

ইসরাইলের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহ। তবে হামলার আগে সীমান্তবর্তী নয়টি গ্রাম খালি করার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

একটানা এই বোমাবর্ষণের কারণে যুদ্ধবিরতি নিয়ে দক্ষিণ লেবাননের বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানায়, শনিবার বেশকটি গ্রামে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি এলাকা সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে।

এনএনএ আরও জানায়, নতুন করে বহু মানুষ দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাইদা ও রাজধানী বৈরুতের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে।

পরে শনিবার হিজবুল্লাহ জানায়, তারা উত্তর ইসরাইলের একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

গোষ্ঠীটি দাবি করে, তাদের যোদ্ধারা ‘ইয়ারা ব্যারাকে’ ড্রোনের ঝাঁক দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এর আগে তারা দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযানের ঘোষণা দেয়।

গত ১৭ এপ্রিল শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শুক্রবার আরও ৪৫ দিন বাড়াতে সম্মত হয় দুই দেশ। তবে শুরু থেকেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বহু অভিযোগ রয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শনিবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোকে স্বাগত জানান। একই সঙ্গে সব পক্ষকে পূর্ণাঙ্গভাবে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানান।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইল লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে। সীমান্তসংলগ্ন কিছু এলাকা এখনও তাদের দখলে রয়েছে।

অন্যদিকে হিজবুল্লাহ নিয়মিত উত্তর ইসরাইল ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলার দাবি করছে। শনিবারও তারা একাধিক হামলার কথা জানিয়েছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধে তাদের এক সেনা নিহত হয়েছে। মার্চের শুরুতে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ২১ সেনা নিহত হলো।

লেবাননের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলি হামলায় দেশটিতে ২ হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর নিহত হয়েছে ৪০০ জনেরও বেশি।

সাম্প্রতিক এই হামলার আগে ওয়াশিংটনে ইসরাইল ও লেবাননের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়। কয়েক দশকের মধ্যে গত মাসে দুই দেশের প্রথম সরাসরি বৈঠকের পর এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

আলোচনায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।

ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ এই আলোচনা প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে। শনিবার তারা লেবাননের খিয়াম শহরে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলারও দাবি করেছে।

গোষ্ঠীটি বলেছে, ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলোতে হামলার জবাব হিসেবেই তারা এ পদক্ষেপ নিয়েছে।

শনিবার এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের প্রস্তাব লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে ‘শত্রুর কাছে একের পর এক বিনা মূল্যের ছাড়’ দেওয়ার নতুন উদাহরণ।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বহু লেবাননের নাগরিক মনে করছেন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো আসলে চলমান হত্যাকাণ্ডেরই সম্প্রসারণ এবং তাদের দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসন আড়াল করার উপায়।

দক্ষিণ লেবাননের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারাও বলছেন, যুদ্ধবিরতি বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না।

৬০ বছর বয়সী আলি সালামেহ বৈরুতের একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ লেবানন ও এর মানুষের ওপর হামলা চলতে থাকলে, মানুষ মারা গেলে, আহত হলে এবং ধ্বংসযজ্ঞ চললে এটাকে যুদ্ধবিরতি বলা যায় না।’

অনেকে আবার ইসরাইলি হামলার জবাবে হিজবুল্লাহর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

দক্ষিণাঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত নাওয়াল মেজহির বলেন, ‘এ কেমন যুদ্ধবিরতি, যখন গ্রামগুলোকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে আর মানুষ আবার ঘরছাড়া হচ্ছে? রাষ্ট্র কোথায়? আমরা শুধু প্রতিরোধের পক্ষেই আছি।’

অন্যদিকে ওয়াশিংটনে লেবাননের আলোচক দল শুক্রবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানায়।

তাদের ভাষ্য, এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির সুযোগ তৈরি করবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার রাজনৈতিক পথ এগিয়ে নেবে।

গত ২ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে রকেট ছোড়ে। এরপরই লেবানন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

শুক্রবার ইসরাইল দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর টাইরেও হামলা চালায়।

এএফপির এক প্রতিবেদক জানান, উপকূলীয় ওই ঐতিহাসিক শহরের ধ্বংসাবশেষের কাছে হামলার স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে।

পায়ে আহত দর্জি ইব্রাহিম কাহওয়াজি বলেন, ‘তারা পুরো এলাকাই ধ্বংস করে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘তারা দক্ষিণাঞ্চলকে জনশূন্য করে দিচ্ছে। এটা প্রকৃত দখলদারিত্ব। আমরা সমাধান চাই।’