শিরোনাম

ঢাকা, ১৪ মে, ২০২৬ (বাসস): অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি ইসরাইলি বসতি থেকে আসা ইহুদি স্লাউটস্কিন স্বপ্ন দেখেন, একদিন তার দেশের সীমান্ত আরও বিস্তৃত হবে এবং তিনি দক্ষিণ লেবাননে গিয়ে বসবাস করবেন। শুধু তিনি নন, এমন ভাবনা আরও অনেকের।
ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর সংঘাতে ১০ লক্ষাধিক লেবানিজ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর ইসরাইলের বসতি স্থাপন আন্দোলনের এক উগ্র ডানপন্থী অংশ এখন দৃষ্টি দিচ্ছে উত্তরের দিকে।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ‘কারনেই শোমরন’ বসতি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
‘উরিৎসাফোন’ বা ‘অ্যাওয়েক, নর্থ উইন্ড’ নামের এই আন্দোলনে কয়েক ডজন পরিবার যুক্ত রয়েছে বলে জানান ৩৭ বছর বয়সী গবেষক জীববিজ্ঞানী স্লাউটস্কিন।
২০২৪ সালে তিনি এ আন্দোলনের সহ-প্রতিষ্ঠা করেন। তার দাবি, এরপর থেকেই এর সমর্থন বেড়েছে।
এই গোষ্ঠী চায়, ইসরাইলের উত্তর সীমান্ত অন্তত লিতানি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হোক।
নদীটি লেবাননের প্রায় ৩০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবাহিত। সেখানে স্থায়ী ইসরাইলি বেসামরিক উপস্থিতিও গড়ে তুলতে চায় তারা।
স্লাউটস্কিন বলেন, ‘ধারণাটি হলো, অধিকাংশ মানুষ সেখান থেকে চলে যাবে, আমরা সীমান্ত সরিয়ে নেব এবং তাদের আর ফিরতে দেব না। এরপর ঘোষণার মাধ্যমে এলাকাটি ইসরাইল রাষ্ট্রের অংশ হয়ে থাকবে।’
২০২৪ সালে গাজায় নিহত তার ভাই, ইসরাইলি সেনা সদস্য ইসরায়েল সকোলের স্মরণে তিনি এই আন্দোলন গড়ে তোলেন।
উত্তর পশ্চিম তীরের কারণেই শোমরন বসতির কাছে সকোলের স্মরণে নির্মিত একটি পাহাড় চূড়ার দর্শনস্থল থেকে এএফপিকে তিনি বলেন, ‘লেবাননে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।’
স্লাউটস্কিন আরও বলেন, ‘তিনি বলতেন, তিনি এমন একটি জায়গায় থাকতে চান যেখানে গ্রীষ্মে চারপাশ সবুজ থাকবে আর শীতে সাদা হয়ে যাবে।’
দক্ষিণ লেবাননে বসতি স্থাপনের এ আন্দোলনের প্রতি ইসরাইল সরকার প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক সমর্থন দেয়নি।
তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণে বড় ধরনের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে ওই ভূখণ্ড সংযুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
পূর্ব জেরুজালেম বাদে অধিকৃত পশ্চিম তীরে বর্তমানে পাঁচ লক্ষাধিক ইসরাইলি বসবাস করছেন।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি অবৈধ। ওই এলাকায় প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বাস করেন।
স্লাউটস্কিনের দাবি, দক্ষিণ লেবাননে ইহুদি বসতি স্থাপনই ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতের চক্র শেষ করবে।
তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী যা করছে, সেটি প্রথম ধাপ।’
তার ভাষায়, ‘সেনাবাহিনী ঢুকবে, দখল নেবে ও এলাকা খালি করবে। এরপর সরে না গিয়ে সেখানে বসতি গড়তে হবে।’
দক্ষিণ লেবাননের কিছু অংশে অভিযান চালানোর পর ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, কতদিনের জন্য তা স্পষ্ট না করলেও, সৈন্যদের সেখানে থাকতে হতে পারে।
গত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। এদিকে ওয়াশিংটনে নতুন দফা আলোচনায় বসেছেন ইসরাইল ও লেবাননের প্রতিনিধিরা।
-‘নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস’-
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপের ৬ শতাধিক সদস্যের একটি চ্যানেলে উরিৎসাফোন অনলাইন বৈঠকের আমন্ত্রণ ও দক্ষিণ লেবাননে কথিত প্রাচীন ইহুদি বসতির মানচিত্র প্রকাশ করে।
অপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টেলিগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে।
চুক্তি ভিত্তিক কৃষি শ্রমিক ওরি প্লাসে আন্দোলনের শুরুর দিকেই এতে যোগ দেন। পশ্চিম তীর ও গাজা- দুই জায়গাতেই বসতি স্থাপনে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
ম্যানহাটন থেকে ১৯৯০-এর দশকে ইসরাইলে পাড়ি জমানো ৫১ বছর বয়সী প্লাসে এএফপিকে বলেন, দেড় বছর আগে তিনি ও আরও কয়েকজন খোলা সীমান্ত ফটক দিয়ে লেবাননে প্রবেশ করেছিলেন।
তার ভাষায়, উদ্দেশ্য ছিল একটি তাঁবু স্থাপন, গাছ লাগানো ও ‘এমন কিছু শুরু করা, যা পরে গতি পাবে।’
অল্প সময়ের মধ্যেই ইসরাইলি সেনারা তাদের বের করে দেয়। তবে অভিজ্ঞতাটিকে ‘অসাধারণ’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
গত ফেব্রুয়ারিতে উরিৎসাফোন সীমান্ত এলাকায় আরেকটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করে।
তারা এমন কিছু ছবি প্রকাশ করে, যেখানে শিশুদের ইসরাইলি পতাকা ও দেয়ালের পাশে টানানো প্ল্যাকার্ডের সামনে হাসিমুখে দেখা যায়।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী এ ঘটনার নিন্দা জানায়।
তাদের দাবি, দুই বেসামরিক ব্যক্তি সীমান্ত বেড়া অতিক্রম করেছিলেন, যা ফৌজদারি অপরাধ এবং এতে বেসামরিক মানুষ ও সেনাদের ঝুঁকি তৈরি হয়।
নিজের বাগানে পুরোনো একটি মালবাহী কনটেইনার খুলে বসতি স্থাপনের বিভিন্ন সরঞ্জাম দেখান প্লাসে। সেখানে ছিল গদি, স্লিপিং ব্যাগ ও প্লাস্টিকের চাদর।
এরপর তিনি একটি বই দেখান, যেখানে আধুনিক মিসরের কিছু অংশ থেকে ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত ইসরাইলের মানচিত্র রয়েছে।
প্লাসে বলেন, ‘যে কেউ ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুসরণ করেন, তার জানা উচিত- ইসরাইলের ভূমি আমাদের জন্য প্রতিশ্রুত। অনেকেই বলেন, নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত।’
-‘গোপন সমর্থন’-
চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে উরিৎসাফোন রাজনীতিকদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করবে বলে জানান প্লাসে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের প্রতিক্রিয়া ‘অস্পষ্ট’ বলেও স্বীকার করেন তিনি।
অন্যদিকে স্লাউটস্কিন দাবি করেন, কয়েকজন আইনপ্রণেতা এমনকি কিছু মন্ত্রীরও সমর্থন রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কেউ প্রকাশ্যে বলেন, কেউ গোপনে বলেন। তবে সমর্থন অবশ্যই আছে।’
গত মাসে উরিৎসাফোন পরিবেশ সুরক্ষামন্ত্রী ইদিত সিলমানের সঙ্গে স্লাউটস্কিনের বৈঠকের একটি ছবি প্রকাশ করে। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ওই ভূখণ্ড দখলের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়।’
লেবাননে বসতি স্থাপনের এই স্বপ্ন এখনো ইসরাইলি সমাজের অতিউগ্র জাতীয়তাবাদী অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে সময়ের সঙ্গে এটি আরও মূলধারায় পরিণত হবে বলে বিশ্বাস করেন স্লাউটস্কিন ও প্লাসে।
নিজের সাদামাটা সাজানো ঘরে গাজার বসতি আন্দোলনের কর্মীদের দেওয়া একটি সম্মাননাপত্র গর্বের সঙ্গে দেখান প্লাসে। এতে স্বাক্ষর রয়েছে উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির ও ইসরাইলি পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার লিমোর সন হার-মেলেখের।
স্লাউটস্কিন বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত জনগণকেই এটি চাইতে হবে। জনগণকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।’