বাসস
  ১৩ মে ২০২৬, ১৯:৩১

যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে, না হলে ‘ব্যর্থতা’: তেহরান

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ১৩ মে, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের প্রধান আলোচক মঙ্গলবার বলেছেন, ওয়াশিংটনকে তেহরানের সর্বশেষ শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে, অন্যথায় তাদের ব্যর্থতার মুখে পড়তে হবে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে কার্যকর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

দুই মাসের বেশি আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে, যার প্রভাব পড়েছে শতকোটি মানুষের জীবনে।

উভয় পক্ষই কোনো ধরনের ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং বারবার যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার হুমকি দিয়েছে। তবে কোনো পক্ষই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফেরার আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, ‘১৪ দফা প্রস্তাবে বর্ণিত ইরানি জনগণের অধিকার মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। অন্য যেকোনো পন্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে; একের পর এক ব্যর্থতা ছাড়া কিছুই বয়ে আনবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা যত বেশি সময়ক্ষেপণ করবে, আমেরিকান করদাতাদের তত বেশি মূল্য দিতে হবে।’

পেন্টাগন মঙ্গলবার জানিয়েছে, যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দুই সপ্তাহ আগে দেওয়া হিসাবের তুলনায় প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রস্তাবের জবাবে ইরান তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব পাঠায়। যদিও ওই মার্কিন প্রস্তাবের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন পরিকল্পনায় যুদ্ধ বন্ধ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারক ছিল।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের জবাবি প্রস্তাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।

কিন্তু ট্রাম্প তেহরানের জবাবকে ‘পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘পূর্ণ বিজয়’ অর্জন করবে এবং এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধবিরতি এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

চীন সফরে রওনা হওয়ার আগে ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান ইস্যুতে ‘দীর্ঘ আলোচনা’ করবেন, তবে যুদ্ধ বন্ধে বেইজিংয়ের সহায়তা তার প্রয়োজন নেই।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা তেহরানে ‘আমেরিকান-জায়নবাদী শত্রুর যেকোনো তৎপরতা মোকাবেলায়’ মহড়া চালিয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালায়ি-নিক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কূটনৈতিক পথ প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ‘সামরিক ময়দানে তাদের আগের পরাজয়ের পুনরাবৃত্তির’ জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

এই বাকযুদ্ধ ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

রাজধানী তেহরানের ৪৩ বছর বয়সী চিত্রশিল্পী মরিয়ম প্যারিসভিত্তিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা শুধু টিকে থাকার জন্য যা পারি আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছি। ভবিষ্যৎ এতটাই অনিশ্চিত যে আমরা দিন গুনে বেঁচে আছি।’

তিনি বলেন, ‘চলতে থাকার উপায় খুঁজছি। এখন আশা ধরে রাখা খুব কঠিন।’

ইরানের পাল্টা প্রস্তাবে ট্রাম্পের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার পর তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দেওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

ইরান ওই জলপথে জাহাজ চলাচল সীমিত করছে এবং জাহাজ পারাপারে টোল আরোপের ব্যবস্থাও করছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যা সৌদি আরবের জ্বালানি কোম্পানি আরমাকোর প্রধান বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ ধাক্কা বলে উল্লেখ করেছেন।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস মঙ্গলবার জানিয়েছে, গোপন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের এখনো উল্লেখযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে। তাদের মোবাইল লঞ্চারের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং যুদ্ধ-পূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের বড় অংশ এখনো সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির পাশে থাকা ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টির সঙ্গে তারা আবার যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করেছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, তেহরানের পক্ষে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ‘গ্রহণযোগ্য নয়’। বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণত এ পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।

কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান অল-থানি মঙ্গলবার বলেন, ‘ইরানের উচিত নয় উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি বা ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র হিসেবে এই প্রণালিকে ব্যবহার করা।’

অন্যদিকে থিঙ্কট্যাঙ্ক  চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ইরানের নেতারা মনে করছেন তারা ‘ট্রাম্পকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন।’

তার মতে, তেহরান আলোচনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও তারা নিজেদের শক্ত অবস্থান থেকে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছে।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে গঠিত ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’ মিশনে অস্ট্রেলিয়া যোগ দেবে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইরানি ড্রোন হামলা থেকে রক্ষায় একটি নজরদারি বিমান পাঠানো হবে। 
লেবানন ফ্রন্টেও মঙ্গলবার দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত ছিল বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

১৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইরান-সমর্থিত হেজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে ইসরাইল হামলা জোরদার করেছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলায় মঙ্গলবার অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন সেনাসদস্য, একটি শিশু এবং দুজন উদ্ধারকর্মী রয়েছেন।

লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ২ মার্চ দেশটি বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৮৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর নিহত হয়েছেন ৩৮০ জন।

হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কানেম মঙ্গলবার বলেন, লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে আসন্ন তৃতীয় দফা আলোচনায় তাদের অস্ত্রের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নয়। তিনি ঘোষণা দেন, ‘ত্যাগ যত বড়ই হোক, আমরা আত্মসমর্পণ করব না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়ব না এবং এটিকে ইসরাইলের জন্য জাহান্নামে পরিণত করব।’