বাসস
  ০৮ মে ২০২৬, ১২:৪৮

যুক্তরাষ্ট-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা, নাজুক যুদ্ধবিরতি নিয়ে শঙ্কা

ঢাকা, ৮ মে, ২০২৬ (বাসস) :  মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলারঘটনা ঘটেছে। ফলে নাজুক যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীতে তিনটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারে ইরানের হামলার পরও যুদ্ধবিরতি বহাল রয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এটিকে ‘তুচ্ছ ঘটনা’ বলেও উড়িয়ে দেন।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের হামলার জবাবে তারা দেশটির সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তবে তেহরানের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি ভেঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম আক্রমণ চালায়। 

এই সংঘাতের কারণে গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। 

এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ইরানের ওপর কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার অবসান ঘটেছিল। 

সেসময় মার্কিন-ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় এবং বিশ্বে তেল ও গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী অবরোধ করেছে।

ওয়াশিংটনে ইরানের যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল আছে কিনা জানতে চাইলে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, যুদ্ধবিরতি বহাল আছে। তারা আজ আমাদের নিয়ে খেলতে চেয়েছিল। আমরা তাদের উড়িয়ে দিয়েছি। তারা তুচ্ছ কাজ করেছে। আমিও এটিকে তুচ্ছই বলবো।’

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, ইরানি বাহিনী তিনটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযান ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। তবে কোনো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

সেন্টকম বলেছে, তারা ‘আসন্ন হুমকি প্রতিহত করেছে এবং দায়ী ইরানি সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।’

তারা আরও জানায়, ‘সেন্টকম উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তবে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।’

অন্যদিকে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি তেলবাহী জাহাজ এবং অন্য আরেকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানি বাহিনী ‘তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন সামরিক জাহাজে পাল্টা হামলা’ চালায়। 

এর একদিন আগেই ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, ‘চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’ তবে তেহরান পিছু না হটলে আবারও হামলার হুমকি দেন।

বৃহস্পতিবারের হামলার পর ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইরান  যদি দ্রুত চুক্তিতে সই না করে, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা আরও কঠোর ও ভয়াবহভাবে জবাব দেব।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কাছে তারা তাদের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে।

বৃহস্পতিবারের গোলাগুলির আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আশাবাদী সুরে টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই যুদ্ধবিরতি একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তিতে রূপ নেবে।’

-লেবানন আলোচনা -

তবে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা দেখা গেছে।

প্যারিসে অবস্থানরত ৪২ বছর বয়সী আলোকচিত্রী শেরভিন তেহরান থেকে এএফপি প্রতিনিধিকে বার্তা পাঠিয়ে জানান, ‘এই আলোচনার কোনো পক্ষই বাস্তবে সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা ট্রাম্পের আরেকটি রাজনৈতিক কৌশল। না হলে এত যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক শক্তি কেন ইরানের দিকে পাঠানো হচ্ছে?’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলে লেবাননের চলামান উত্তেজনাও কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে বুধবার দক্ষিণ বৈরুতে ইসরাইলি হামলায় হিজবুল্লাহর এক কমান্ডার নিহত হওয়ার পর সেখানে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে আগামী ১৪ ও ১৫ মে নতুন দফা আলোচনার কথা রয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এটি হবে দু’দেশের মধ্যে তৃতীয় দফার বৈঠক। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশ দুটি কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে এবং তাদের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মঙ্গলবার বলেন, ইসরাইল এবং লেবাননের মধ্যে ‘খুব শিগরিরই’ শান্তিচুক্তি সই করা সম্ভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমস্যাটি ইসরাইল বা লেবানন সরকার নয়; এক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিজবুল্লাহ। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালানোর পর লেবাননও এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

- বহু জাহাজ হরমুজে আটকা- 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতের কারণে বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় দেড় হাজার জাহাজ এবং ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছেন। পানামায় অনুষ্ঠিত ‘মেরিটাইম কনভেনশন অব দ্য আমেরিকাস’ সভায় তিনি এ তথ্য জানান।

ট্রাম্প সম্প্রতি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে স্বল্প সময়ের জন্য একটি নৌ অভিযান শুরু করেছিলেন। তবে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত পেয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা স্থগিত করা হয়।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সমর্থন না দেওয়ায় বরাবরই কড়া সমালোচনা করে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। 

তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন দার লেয়েনের সঙ্গে তার ‘চমৎকার’ ফোনালাপ হয়েছে। ইরান কখনই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না—এ বিষয়ে তারা ‘সম্পূর্ণ একমত’ বলে জানিয়েছেন উরসুলা।