বাসস
  ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৩৯

অ্যাডেল থেকে রেই : ভবিষ্যৎ তারকা তৈরির কারখানা ব্রিটেনের যে স্কুল

ঢাকা, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস): বিনোদন জগতে সাফল্যের কোনো নির্ভুল সূত্র যদি থেকে থাকে, তবে তার সঠিক প্রয়োগের জন্য লন্ডনের ব্রিট স্কুলকে সাধুবাদ ও অভিবাদন জানানো উচিত।

গায়িকা অ্যামি ওয়াইনহাউস, অ্যাডেল ও রেই, পাশাপাশি অভিনেতা টম হল্যান্ড, যিনি স্পাইডারম্যান চরিত্রে বেশি পরিচিত, সবাই এই রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত ও বিনামূল্যের স্কুলটির সাবেক শিক্ষার্থী।

লন্ডন থেকে এএফপি জানায়, ২০২৬ সালটি স্কুলটির জন্য দারুণভাবে শুরু হয়েছে। সাবেক দুই শিক্ষার্থী অলিভিয়া ডিন ও লোলা ইয়াং লস অ্যাঞ্জেলেসে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে সম্মাননা পেয়েছেন।

ডিন ‘বর্ষসেরা নতুন শিল্পী’ নির্বাচিত হয়েছেন, আর ইয়াং তার জনপ্রিয় গান ‘মেসি’র জন্য জিতেছেন ‘সেরা পপ সোলো পারফরম্যান্স’ পুরস্কার।

দুই শিল্পীই পরে যুক্তরাজ্যের প্রধান সংগীত পুরস্কার ব্রিট অ্যাওয়ার্ডসেও সাফল্য পান।

ব্রিট স্কুলের সংগীত বিভাগের উপপ্রধান ও তাদের সাবেক শিক্ষক ক্রিস ম্যাকইনেস বলেন, ‘এটি সত্যিই আমাদের জন্য অত্যন্ত বিনয়ী হওয়ার মতো বিষয়।’

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘তাদের সাফল্যের কৃতিত্ব আমরা কখনোই নিজেদের নিতে চাই না... আমরা শুধু এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চাই, যেখানে সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকা শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিকশিত করতে পারে।’

১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী এই স্কুলে পড়াশোনা করে। তারা এখানে জিসিএসই ও এ-লেভেলসহ যুক্তরাজ্যের নিয়মিত পাঠ্যক্রমের পরীক্ষাগুলোও দেয়।

প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীরা হাসিমুখে স্কুলে আসে, করিডোরে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে।

কেউ গুনগুন করে গান গায়, কেউবা রেকর্ডিং স্টুডিওতে চুপচাপ কাজ করে।

একটি কক্ষের ভেতর দেখা গেল, কয়েকজন শিক্ষার্থী ‘সিক্স’ নামের মিউজিক্যালের একটি পরিবেশনার মহড়া দিচ্ছে।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য

১৮ বছর বয়সী কিবোর্ডবাদক লুক ক্রাউন ও ১৯ বছর বয়সী গায়িকা নাওমি সাইমন মে মাসের একটি কনসার্টের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

ক্রাউন বলেন, ‘এটি খুবই ব্যতিক্রমধর্মী একটি জায়গা। এত গভীরভাবে জনপ্রিয় সংগীত শেখার সুযোগ আর কোথাও নেই।’

নাওমি সাইমন জানান, এই স্কুলের কারণে তিনি ইতোমধ্যে ‘দারুণ বড় একটি সুযোগ’ পেয়েছেন—গায়িকা রেইয়ের সর্বশেষ অ্যালবামে ব্যাকআপ কোরাসে গান গাওয়ার সুযোগ।

তিনি বলেন, স্কুলটি যদি ফি-নির্ভর হতো, তাহলে এসব সম্ভব হতো না।

‘আমার পরিবার খুব সচ্ছল নয়... তাই এমন একটি জায়গায় পড়তে পারা, যেখানে অর্থ কোনো বাধা নয়, সত্যিই অসাধারণ,’ বলেন তিনি।

স্কুলটির প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থায়ন রাষ্ট্র থেকে আসে। বাকি অংশ বিভিন্ন সমর্থক ও কোম্পানির সহায়তায় পরিচালিত হয় বলে জানান প্রধান শিক্ষক স্টুয়ার্ট ওয়ার্ডেন।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বের প্রয়োজন বৈচিত্র্যময় কণ্ঠস্বর... তাই সমাজের সব শ্রেণির মানুষের শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের ভাবনা প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যারা শুধু ব্যালে শেখার খরচ বহন করতে পারে, তারাই কেন নৃত্যশিল্পী হবে?’

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দক্ষিণ লন্ডনের সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় ও নিম্নআয়ের এলাকা ক্রয়ডনে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলে ওয়ার্ডেন গত ৩২ বছর ধরে কাজ করছেন।

স্কুলের অভ্যর্থনা কক্ষে সাবেক শিক্ষার্থীদের ছবি টাঙানো রয়েছে। কেউ সিনেমার স্টান্ট সমন্বয়কারী, কেউ আবার ইউরোভিশনে আলোক প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজ করছেন।

‘ভালো মানুষ হও’ 

ম্যাকইনেস সম্প্রতি এক দশক আগে স্কুল ছেড়ে যাওয়া সাবেক শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনীর আয়োজন করেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘তারা কেউ বিপুল অর্থ উপার্জন করুক বা পরিচিত মুখ হোক না কেন... ১০ বছর পরও তারা এই শিল্পের সঙ্গেই যুক্ত ছিল।’

অ্যাডেল, রেই ও অলিভিয়া ডিনের মতো শিল্পীরা নিয়মিত ব্রিট স্কুলের কথা উল্লেখ করেন। রেই এখনো নতুন গান ওয়ার্ডেনকে শুনিয়ে মতামত নেন।

২০২২ সালে বিবিসি রেডিও ফোরকে অ্যাডেল বলেছিলেন, ‘ওখানে আমি জীবনের সেরা সময় কাটিয়েছি। এটি কোনো একেবারে মঞ্চকেন্দ্রিক স্কুল নয়, কিন্তু করিডোরে অবশ্যই কাউকে না কাউকে ঘুরতে ঘুরতে গান গাইতে দেখা যেত।’

তিনি আরও বলেন, ‘সব ধরনের কিশোর-কিশোরীর এক অসাধারণ মেলবন্ধন ছিল সেখানে... এক কথায় স্বর্গের মতো।’

২০২০ সালের লকডাউনের সময় ‘টম হল্যান্ডই প্রথম দিকের শিক্ষার্থীদের একজন, যিনি নিজের শোবার ঘর থেকে অনলাইনে অভিনয়ের ক্লাস নিয়েছিলেন,’ স্মৃতিচারণ করেন ওয়ার্ডেন।

ম্যাকইনেস তার শিক্ষার্থীদের একটি সহজ পরামর্শ দেন: ‘একজন আরেকজনের প্রতি ভালো আচরণ করো।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিভাবান মানুষের অভাব নেই। কিন্তু আপনি যদি সহযোগিতাপূর্ণ না হন, নির্ভরযোগ্য না হন, সদয় ও সহানুভূতিশীল না হন, তাহলে কেউ আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাইবে না।’

শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন কিছু শেখার জন্যও উৎসাহ দেওয়া হয়। তারা দুই বছর শুধু আরঅ্যান্ডবি গান লেখা বা হেভি মেটাল বাজিয়ে কাটাতে পারে না।

শিক্ষকেরা এখনো মনে করতে পারেন, বছরের শেষের অনুষ্ঠানে অ্যাডেলের মঞ্চ পরিবেশনার কথা।

ম্যাকইনেস বলেন, ‘সেদিনের অনুষ্ঠান শেষে সবাই বলছিল; আমরা আসলে একটু আগেই অসাধারণ কিছু দেখলাম।’