বাসস
  ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:১০

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনিশ্চয়তায় উপসাগরীয় দেশগুলো

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের নজিরবিহীন হামলার ধাক্কা সামলেও উপসাগরীয় ধনী দেশগুলো এখন যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এক অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। আলোচনা স্থবির হয়ে পড়া এবং কৌশলগত প্রণালী হরমুজ কার্যত বন্ধ থাকায় তাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হুমকির মুখে পড়েছে। এখবর এএফপি’র।

প্রণালী হরমুজে অবরোধ আরোপ করে ইরান উপসাগরীয় জ্বালানি রপ্তানিতে আঘাত হেনেছে। পাশাপাশি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো মেরামতে কয়েক মাস কিংবা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও নতুন করে হামলার আশঙ্কা উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলনির্ভর অর্থনীতির বাইরের খাতগুলোকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। নিরাপদ বিনিয়োগ ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার যে পরিকল্পনা উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরছিল, তা এখন হুমকির মুখে।

এখনও স্পষ্ট নয়, হরমুজ প্রণালী ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে কেন্দ্র করে চলা অচলাবস্থা নিরসনের আলোচনা উপসাগরীয় দেশগুলোর মূল উদ্বেগ—গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং তার ক্ষেপণাস্ত্র ও মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা, এসব বিষয়ে কোনো সমাধান দিতে পারবে কি না।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ যত দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তায় থাকবে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও তত বিলম্বিত হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে ঐতিহ্যগত মার্কিন মিত্র দেশগুলোর প্রভাবও কমে আসবে।

বেতনহীন ছুটি

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক দানিয়া সাফের বলেন, ‘যদি প্রণালী হরমুজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে। আর তারা ইতোমধ্যেই ক্ষতির শিকার হয়েছে।’

কাতার ইতোমধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করেছে। পাশাপাশি কুয়েত ও বাহরাইনের জ্বালানি উৎপাদনকারীরা ‘ফোর্স মাজর’ ঘোষণা করেছে।

দুবাইয়ে এখন তুলনামূলক কম যানজট এবং পর্যটন এলাকায় অস্বাভাবিক নির্জনতা দেখা যাচ্ছে, যা এখনও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে না পারা শহরের চিত্র তুলে ধরছে।

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির কয়েক সপ্তাহ পর প্রাথমিক আতঙ্ক কিছুটা কমেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে এক মাসের বেশি সময় অনলাইনে ক্লাস চালুর পর শিশুরা আবার স্কুলে ফিরতে শুরু করেছে।

তবে বহু পরিবার অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী এখনও অনলাইনে পাঠ নিচ্ছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউএইর স্কুলগুলো বিশেষ মহড়ার ব্যবস্থাও করেছে।

একটি বিলাসবহুল হোটেলের এক কর্মী জানান, কিছু কর্মীকে বেতনহীন ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। আরেকটি বিউটি সেলুনের কর্মী বলেন, তাদের বেতনও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্ধেক এ বছর অর্থনৈতিক সংকোচনের মুখে পড়তে পারে। আর সৌদি আরব ও ইউএইতে প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইএমএফের জিহাদ আজুর এএফপিকে বলেন, বড় এবং তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের শক্তিশালী আর্থিক সক্ষমতা দিয়ে আবার অর্থনীতি চাঙ্গা করতে পারবে। তবে তা নির্ভর করছে সংকট কতদিন স্থায়ী হয় এবং চূড়ান্ত সমাধান ভবিষ্যতের জন্য কতটা নিশ্চয়তা দিতে পারে তার ওপর।

‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ 

হরমুজ প্রণালী অবরোধ উপসাগরীয় দেশগুলোর এ নৌপথের ওপর নির্ভরশীলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

তবে ইউএই ও সৌদি আরবের মতো যেসব দেশের পাইপলাইন সুবিধা রয়েছে এবং যেগুলো দিয়ে কিছু জ্বালানি রপ্তানি প্রণালী হরমুজ এড়িয়ে করা যায়, তাদের অর্থনীতি বহুমুখীকরণের পরিকল্পনাও এখন ঝুঁকির মুখে।

দক্ষ জনশক্তি ও পর্যটক আকর্ষণ করতে স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টারের আঞ্চলিক কেন্দ্র হওয়ার পরিকল্পনাও স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করছে।

থাফের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আসলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এক প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, যদি ইরানকে ‘অসীম সময়ের জন্য তাদের অর্থনীতির ওপর ভেটো ক্ষমতা’ বজায় রাখতে দেওয়া হয়, তাহলে তা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি হবে।

আলোচনায় ইসরাইল নেই, কিন্তু যে কোনো সময় তারা পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে।

থাফের বলেন, ‘ইসরাইল কি ইরানে বারবার হামলার কৌশল অব্যাহত রাখবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘আর ইরান কি পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আবার প্রণালী হরমুজ বন্ধ করবে বা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে হামলা চালাবে?’

‘এটাই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি—উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা এবং এ সংকটের কোনো শেষ না থাকা।’

‘সম্মান রক্ষার প্রস্থানপথ’

যুদ্ধ এবং ইরান ইস্যুতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান বিভক্ত। ইউএই, যেটি ইরানের হামলার সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে, তারা তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং যে কোনো চুক্তিতে সর্বোচ্চ শর্ত আরোপের পক্ষে মত দিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে।

থাফের বলেন, ‘ইরান ছিল হিসাবি কৌশলে এগিয়েছে। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় হামলা চালিয়ে ইরানকে ঘিরে ভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা-ঝুঁকির ধারণা তৈরি করেছে।’

গত মে মাসে উপসাগরীয় সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানানো হলেও, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলো আলোচনার বাইরে থেকে গেছে—যদিও সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে তারাই রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের হাসান আলহাসান বলেন, ‘ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণ প্রভাবিত করতে উপসাগরীয় দেশগুলো ব্যর্থ হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে চায়নি—কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তবুও তা করেছে। তাই এখন আলোচনায় ওয়াশিংটন তাদের নিরাপত্তা-স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে না, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’

আলহাসানের মতে, ট্রাম্প এখন ‘সম্মান রক্ষার একটি প্রস্থানপথ’ খুঁজছেন।