বাসস
  ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:৪৮

মিয়ানমারে ভূমিকম্পের এক বছর পরও পুনর্গঠনে ধীরগতি

ঢাকা, ১ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস)  : গত বছরের  ২৮ মার্চ মিয়ানমারে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের এক বছর পরও পুনর্গঠন কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। 

ভয়াবহ ওই ভূমিকম্পে মিয়ানমারে ৩ হাজার ৮০০ জনের বেশি ও প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডে অন্তত ৯০ জন প্রাণ হারায়।

ভয়াবহ ভূমিকম্পে মান্দালয়ের সড়কে তৈরি হওয়া বড় বড় গর্তগুলো ভরাট করা হয়েছে। উত্তর মিয়ানমারের ওই সড়কের কিছু অংশ নতুন করে পাকা করা হয়েছে। 

তবে ঐতিহাসিক আভা ব্রিজের ভেঙে যাওয়া অংশগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটি সরানো হয়েছে। বাকি অংশ এখনো ইরাবতী নদীর দিকে ঝুলে আছে। ওই নদীতেই দুর্যোগের পর গৃহহীন কয়েকশ মানুষ গোসল করেন। 

মান্দালয় থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

ভূমিকম্পের সময় মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদো-এ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হিসেবে একমাত্র এএফপি উপস্থিত ছিল। তাদের দলই প্রথম আন্তর্জাতিক সাংবাদিক হিসেবে মান্দালয়ে পৌঁছায়।

এক বছর পর, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ফিরে গিয়ে প্রতিবেদকরা পুনর্গঠনের মিশ্র চিত্র দেখেছেন।

নেপিদোতে প্রধান হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ধসে পড়া কংক্রিটের ছাউনি পড়ে একটি গাড়ি চূর্ণ হয়। সেই জায়গায় হালকা কাঠামোর নতুন ছাউনি তৈরি হয়েছে। এতে প্লাস্টিকের ছাদ বসানো হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যে ঘটা ভূমিকম্প-পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞ তুলে ধরা এএফপি’র তোলা অসংখ্য ছবির মধ্যে সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের একটি বিরল অসতর্ক ছবিতে তাকে হাসপাতালে উদ্ধারকার্য পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার সময় হতবিহ্বল দেখায়।

জঙ্গলে ঘেরা পাহাড় ও আঁকাবাঁকা ইরাবতী নদীর মাঝে অবস্থিত, প্রাচীন রাজধানী মান্দালয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমারাপুরার একটি প্যাগোডায় ইটের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে একটি শায়িত বুদ্ধমূর্তি আংশিকভাবে দৃশ্যমান। মূর্তিটির মুখ পরিষ্কার করা হয়েছে।

৭০ বছর বয়সী বোর্ড সচিব হসান তুন বলেন, ‘কেউ কেউ বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ করছেন, আবার কেউ এখনো কাজ ও জীবিকা চালানোর জন্য সহায়তা পাচ্ছেন।’

তিনি জানান, ওই প্যাগোডায় চারজন মারা গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ধ্যানরত এক কিশোরীও ছিল।
তিনি বলেন, ‘বুদ্ধের আশীর্বাদেই আমরা বেঁচে গেছি।’

মান্দালয়ের প্রায় সব ভেঙে পড়া আবাসিক ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরানো হয়েছে। কিছু পুনর্নির্মাণ হয়েছে। আবার চারপাশ ঘেরা কিছু জায়গা এখনও খালি পড়ে আছে।

প্রাসাদের খালের পাশের হেলে পড়া টাওয়ারগুলো আবার সোজা করা হয়েছে। সেগুলোর প্রতিরক্ষামূলক দেয়ালের জন্য নতুন ইটের কাঠামো তৈরি করছেন শ্রমিকরা।

ভূমিকম্পের পর, যাদের ঘরবাড়ি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল বা যারা আফটারশকের ভয়ে ছিলেন, তারা কয়েক সপ্তাহ খালের ধারে খোলা আকাশের নিচে ছিলেন। 

এখন আবার সেখানে সকাল বেলার দৌড়বিদ ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা চলছে।

— ‘আকাশ ভেঙে পড়লে’ —

থাহতে কিয়াং মঠের কিছু ভবন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, যেখানে ভূমিকম্পের পরের দিনগুলোতে গেরুয়া পোশাক পরা ভিক্ষুরা হাতে করে ধ্বংসাবশেষ সরিয়েছিলেন।

মঠঅধ্যক্ষ ইউ থুদাসা বলেন, ‘মানুষ নানা অর্থনৈতিক কষ্টে আছে।’ যেমন বলা হয়, ‘আকাশ ভেঙে পড়লে সবার ওপরই পড়ে।’

৭০ বছর বয়সী এই ভিক্ষু আরও বলেন, ‘যা আছে, তা দিয়েই যতটা পারি গড়ে তুলছি। থেমে থাকলে চলবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ জীবনের অংশ হয়ে থাকবে।’

আমারাপুরার নাগায়োন প্যাগোডায় একটি বুদ্ধমূর্তি, যা আগে শুধু দুটি পা ও হাতসহ ভগ্ন অবস্থায় ছিল, সেটি পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এখন তা শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

পাশের বোন ওয়ে গ্রামে ভূমিকম্পে একটি মসজিদ ধসে পড়ে। রমজানের শেষ শুক্রবার জুমার নামাজে জড়ো হওয়া মুসল্লিদের ওপর সেটি ভেঙে পড়ে। এতে অনেকের মৃত্যু হয়।

এখনো সেখানে স্থায়ী কোনো ভবন নির্মাণ করা হয়নি। ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন, যা এখনও পাওয়া যায়নি।

এর পরিবর্তে, পুরুষরা সবুজ ত্রিপল ও খেজুরপাতার ছাউনি দেওয়া অস্থায়ী কাঠামোয় সন্ধ্যার নামাজ আদায় করছেন।

মসজিদের ইমাম খিন মাউং নাইং ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী হিসাব করে বলেন, ‘গতকাল ছিল ওই দুর্যোগের এক বছর পূর্তি।’

তিনি বলেন, ‘এখনও যে কোনো জোরে শব্দে সবাই আঁতকে ওঠে।’

নাইং আরও বলেন, ‘এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ভূমিকম্প, সেই দৃশ্য, সেই অনুভূতি— মনে হয় যেন গতকাল বা পরশুর ঘটনা। আজও তা হৃদয়ে রয়ে গেছে।’