বাসস
  ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৪:০৯

হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ আরও বিস্তৃত

ঢাকা, ২৯ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। তারা দেশটিতে দুটি হামলার দাবি করেছে। এতে লোহিত সাগর অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে।

এদিকে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ইরানে কয়েক সপ্তাহের স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও কোনো মোতায়েনের অনুমোদন দেননি।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

হুথিদের সম্পৃক্ততায় সংঘাত নতুন জটিলতা পেয়েছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা এ যুদ্ধে প্রভাবিত হয়েছে।

গাজায় ইসরাইলের সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে হুথিরা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে জাহাজে হামলা চালায়। এতে শিপিং কোম্পানিগুলোকে ব্যয়বহুল বিকল্প পথ বেছে নিতে হয়।

শনিবার পর্যন্ত তারা এ সংঘাতে সরাসরি জড়ায়নি।

হুথিদের এক মুখপাত্র শনিবার বলেন, তারা ইসরাইলের ‘গুরুত্বপূর্ণ ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বহর’ নিক্ষেপ করেছে।

সৌদি আরব তার তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ লোহিত সাগরের মাধ্যমে ঘুরিয়ে দিয়েছে, যাতে হরমুজ প্রণালী এড়ানো যায়। 

ইরান দাবি করেছে যে তারা শত্রুভাবাপন্ন শক্তিগুলোর জাহাজ চলাচলের জন্য এই প্রণালীটি বন্ধ করে দিয়েছে।

-ইরানের হুঁশিয়ারি-

শনিবার ইরানে হামলা অব্যাহত থাকে। 

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা তেহরানে ইরানের মেরিন ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে। 

তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরনের নৌ অস্ত্র তৈরি করত।

শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে কয়েক মিনিট ধরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তবে এর লক্ষ্যবস্তু কী ছিল, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

ইসরাইলের সামরিক মুখপাত্র বলেন, ইরানের সামরিক শিল্পে হামলা জোরদার করা হয়েছে। ‘কয়েক দিনের মধ্যেই সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা সম্পন্ন করা হবে।’

তেহরানের এক শিল্পী এএফপিকে বলেন, ‘আমি শান্তিতে ঘুমানোর রাত মিস করি।’ 


তিনি আরও বলেন, আগের রাতের হামলা এতটাই তীব্র ছিল যে মনে হচ্ছিল পুরো তেহরান কাঁপছে।

রোববার ইরানের বিপ্লবী গার্ড হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার নিন্দা আনুষ্ঠানিকভাবে না জানায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে।
কাতারে টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক মার্কিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস রয়েছে।
-পাকিস্তানের মধ্যস্থতা-

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে বিমান হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ সংঘাত শুরু হয়। এতে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু হয়।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান কাজ করছে। সোমবার ইসলামাবাদে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের বৈঠক হবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আগ্রাসন বন্ধে মধ্যস্থতার জন্য ইসলামাবাদকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। 

জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল শুক্রবার বলেন, খুব শিগগিরই পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি বৈঠক হতে পারে।

ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, এ বৈঠক এ সপ্তাহেই হতে পারে। তিনি একটি ১৫ দফা পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। ওয়াশিংটনের মতে এতে করে  ‘সব সমস্যার সমাধান করতে পারে।’

শুক্রবার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক বহনকারী উভচর হামলা জাহাজ ইউএসএস ট্রিপোলি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এতে ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযানের জল্পনা বেড়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, পেন্টাগন ইরানে কয়েক সপ্তাহের স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে। এতে খার্গ দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালীর আশপাশের এলাকায় অভিযান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে ট্রাম্প এখনো এই অভিযানের অনুমোদন দেননি।

-লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত-

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও তীব্র হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী প্রায় অচল হয়ে পড়েছে এবং ওই অঞ্চলে অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রয়েছে।

অনেক উপসাগরীয় চালান ওমানের সালালাহ বন্দরে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ড্রোন হামলার পর ডেনিশ শিপিং কোম্পানি মার্স্ক সেখানে সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

আবুধাবির খালিফা ইকোনমিক জোনে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় আগুন লাগে। এতে ছয় জন আহত হন। এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে।

বিমান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে। কুয়েত ও ইরাকি কুর্দিস্তানের ইরবিলে বিমানবন্দরে ইরানের হামলার প্রভাব 
পড়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি আঞ্চলিক নেতা নেচিরভান বারজানির বাসভবনে ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছে। 

তারা ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের দায়ী করে, একে ‘ইরাকের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত’ বলে মন্তব্য করেছে।

ইরাকে কিরকুকের কাছে এক হামলায় সাবেক প্যারামিলিটারি জোটের তিন যোদ্ধা নিহত হয়েছে। মসুলে আরেক হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়। 

উভয় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করা হয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইরানি হামলা প্রতিরোধে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। 

তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ছেড়ে এ অঞ্চলে এসে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ড্রোনবিরোধী সহযোগিতা চুক্তি সই করছেন।

- লেবাননে সাংবাদিক নিহত-

লেবাননেও হামলা অব্যাহত রয়েছে। ২ মার্চ তেহরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট ছোড়ার পর দেশটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

শনিবার দক্ষিণ লেবাননে তিন জন সাংবাদিককে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। তাদের মধ্যে আল মানার টেলিভিশনের প্রতিবেদক আলি শোয়েবও রয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লেবাননে ইসরাইলি হামলার খবর প্রচার করতেন।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাকে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ করেছে এবং বলেছে, তিনি ‘সাংবাদিকের ছদ্মবেশে’ কাজ করছিলেন।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামসহ দেশটির কর্তৃপক্ষ এ হত্যাকাণ্ডকে 

যুদ্ধাপরাধ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের হামলায় আরও নয় জন প্যারামেডিক নিহত হয়েছেন।