শিরোনাম

ঢাকা, ২৪ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধে ‘খুব ভালো’ আলোচনা চলছে বলে দাবি করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মঙ্গলবার ইসরাইলের দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান।
তবে তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোনো ধরনের আলোচনা চলছে না।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
ট্রাম্পের এই আকস্মিক মন্তব্যে অস্থির বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তেলের দামও কমে আসে। এর আগে তিনি ইরানকে স্ট্রেইট অব হরমুজে নৌপথ খুলে দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেন। না হলে, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্র ‘গুঁড়িয়ে দেবে’ বলে হুঁশিয়ারি দেন।
ট্রাম্প জানান, তার প্রশাসন ইরানের এক ‘শীর্ষ ব্যক্তির’ সঙ্গে কথা বলছে।
তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে ‘আমরা বোমা হামলা চালিয়েই যাব’ বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এক ইসরাইলি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, ওই ব্যক্তি ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ। তিনি দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী বেসামরিক নেতা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার এ সপ্তাহেই পাকিস্তানে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। এতে যোগ দিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট এ সব খবর অস্বীকার করেননি।
তবে তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত, বৈঠক নিয়ে জল্পনাকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ জানান, তিনি সোমবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন।
এ সময় আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামাবাদের সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।
তবে গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ বলেন, ‘কোনো আলোচনা হচ্ছে না।’
তার দাবি, ট্রাম্প আর্থিক ও তেলের বাজারকে প্রভাবিত করতে এমন বক্তব্য দিচ্ছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, ‘বন্ধুপ্রতিম কিছু দেশ থেকে আলোচনার অনুরোধের বার্তা পাওয়া গেছে।’
তবে বাস্তবে কোনো আলোচনা হয়নি বলেই জানান তিনি।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন।
ওয়াশিংটন মনে করছে, একটি সমঝোতার সম্ভাবনা আছে। তবে ইসরাইলের নিরাপত্তার স্বার্থে ইরান ও লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর দেয়।
ইসরাইলের উদ্ধার কর্মীরা উত্তরে একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ছবি প্রকাশ করেছে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, রাতে দক্ষিণ বৈরুতে সাতটি বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।
-‘ট্রাম্পই প্রথম পিছু হটলেন’-
সোমবার ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি থেকে সরে আসায় প্রতিবেশী দেশগুলো কিছুটা স্বস্তি পায় ।
এর আগে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, প্রতিশোধ হিসেবে তারা নৌমাইন স্থাপন করবে এবং পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামোতে হামলা চালাবে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারত।
ইসরাইলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘ট্রাম্পই আগে পিছু হটেছেন।’
তার মতে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হলে বড় ধরণের পাল্টা আঘাত আসবে— এটি বুঝেই এই সিদ্ধান্ত।
মার্কিন সেনাদের হাজারো সদস্য ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে। সপ্তাহের শেষে স্থল অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনার পর এ মোতায়েন জোরদার করা হচ্ছে।
—অর্থনীতির জন্য ‘বড় হুমকি’—
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান স্ট্রেইট অব হরমুজে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথে পরিবহন হয়।
পাশাপাশি উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনা, মার্কিন দূতাবাস ও ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে তেহরান।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হবে। এতে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট ও ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মিলিত প্রভাবের চেয়েও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
সংঘাতের কারণে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পর তা দ্রুত কমে যায়।
এদিকে ইউরোপ ও ওয়াল স্ট্রিটে ঊর্ধ্বগতির ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার এশিয়ার বাজারও ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
ট্রাম্প বলেন, আলোচনায় ইতোমধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা’ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শর্তের মধ্যে রয়েছে— ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হবে ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছাড়তে হবে।
-লেবাননে স্থল অভিযান-
যুদ্ধের সময়সীমা ও লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন। শুক্রবার তিনি অভিযান ‘গুটিয়ে নেওয়ার’ কথা বললেও, পরে আবার ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি দেন।
নেতানিয়াহু দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের কথা বলেছেন।
তার মতে, ইরান হামাসকে সমর্থন দেয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পরই গাজা যুদ্ধ শুরু হয়।
লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল অভিযান জোরদার করেছে ইসরাইল। ‘কয়েক সপ্তাহ লড়াই চলবে’ বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সোমবার দক্ষিণ বৈরুতে আবারও হামলা চালানো হয়। দুই হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে আটক করার দাবি করেছে ইসরাইল।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরাইলের হামলায় এক সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১০ লক্ষাধিক মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য মতে, যুদ্ধে ইরানে অন্তত ৩ হাজার ২৩০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৪০৬ জন বেসামরিক নাগরিক।
তবে এএফপি সরাসরি এ সব স্থানে প্রবেশ করতে পারেনি ও স্বাধীনভাবে এই তথ্য যাচাই করতে পারেনি।