শিরোনাম

ঢাকা, ১৫ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে তিনি এখনো প্রস্তুত নন।
এমন সময় মার্কিন মিত্র ইসরাইল রোববার নতুন দফা হামলা চালিয়েছে এবং তেহরানের বিপ্লবী গার্ড ইসরাইলি নেতাকে খুঁজে বের করে হত্যার হুমকি দিয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে এএফপি জানায়. এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তেহরান আলোচনায় বসতে আগ্রহী বলে তিনি মনে করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র আরও ভালো শর্ত আদায়ের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং প্রয়োজনে আবারও ইরানের তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপে হামলা চালাতে পারে, ‘শুধু মজার জন্য’ও।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও উভয় পক্ষই তাদের বক্তব্যে কোনো নরম অবস্থান নেয়নি। এদিকে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তেলের দাম বাড়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং হতাহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান চুক্তি করতে চায়, কিন্তু আমি এখনই তা করতে চাই না, কারণ শর্তগুলো এখনো যথেষ্ট ভালো নয়।’
তিনি সতর্ক করেন, তেলবাহী জাহাজ চলাচলের পথ পরিষ্কার করতে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর উত্তরে ইরানের উপকূলীয় এলাকায় হামলা বাড়াতে পারে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি লিখিত বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার অঙ্গীকার করেছেন। তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, তার প্রতিপক্ষ আদৌ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছেন কি না তা স্পষ্ট নয়।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি না তিনি আদৌ জীবিত আছেন কি না। এখন পর্যন্ত কেউ তাকে দেখাতে পারেনি।’
শনিবার ইরান বলেছে, ‘নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই,’ যদিও তিনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি।
এদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী পশ্চিম ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন দফা হামলার ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-কে অপরাধী আখ্যা দিয়ে তাকে খুঁজে বের করে হত্যার অঙ্গীকার করে।
তেহরানে ক্যাফে আবার খুলছে
যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের ইরাক ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো মার্কিন দূতাবাস ও পশ্চিমা সেনাদের ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
সব পক্ষের কঠোর বক্তব্য সত্ত্বেও তেহরানের নাগরিকরা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে স্বাভাবিক পরিবেশে তাদের কাজের সপ্তাহ শুরু করতে পেরেছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি হামলায় আগের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এই যুদ্ধ শুরু হয়।
গত সপ্তাহের তুলনায় রাজধানীতে যানজট বেশি ছিল এবং কিছু ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ আবার খুলেছে।
এক বাসিন্দাকে বৈদ্যুতিক হোভারবোর্ডে করে রাস্তায় চলতে দেখা গেছে।
রাজধানীর উত্তরের জনপ্রিয় কেনাকাটার কেন্দ্র তাজরিশ বাজারের এক-তৃতীয়াংশের বেশি দোকান আবার খুলেছে। পারস্য নববর্ষ নওরোজ আসতে তখনো পাঁচ দিন বাকি।
কিছু ক্রেতাকে এটিএম বুথে নগদ টাকা তুলতে লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে।
দেশের অন্যতম বড় ব্যাংক ব্যাংক মেল্লির অনলাইন কার্যক্রম সাম্প্রতিক দিনে অচল হয়ে পড়েছিল।
এদিকে কিছু যাত্রীকে বাসস্টপে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে, যেগুলো যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ফাঁকা ছিল।
আন্তর্জাতিক নৌ-অভিযানের প্রস্তাব
ট্রাম্প বলেছেন, আন্তর্জাতিক নৌ-অভিযানের মাধ্যমে তেলবাহী জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপত্তা দিয়ে পার করানো হতে পারে। এতে তেলের দামের ওপর চাপ কমবে এবং যেসব দেশের অর্থনীতি এই সংঘাতের কারণে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তাদের সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ‘আশা করি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য এবং অন্যরা, যারা এই কৃত্রিম সীমাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত, তারা এই এলাকায় জাহাজ পাঠাবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানায়নি।
মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আগেও যেমন বলেছি, আমরা বর্তমানে আমাদের মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে অঞ্চলটির নৌপরিবহন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছি।’
দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, তারা ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য ‘ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি-র ক্ষমতাসীন দলের নীতিবিষয়ক প্রধান তাকাইউকি কোবায়াশি বলেছেন, বিদ্যমান আইনের অধীনে জাপানি নৌবাহিনীর জাহাজ ওই অঞ্চলে পাঠানোর মানদণ্ড ‘অত্যন্ত কঠোর’।
রবিবার বাহরাইন এবং সৌদি আরব আলাদাভাবে জানিয়েছে, নতুন করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
রাজধানী মানামা-য় এক এএফপি সাংবাদিক সতর্কতামূলক সাইরেন শুনেছেন।
শনিবার রাতে দুবাই কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও কিছু হামলা প্রতিহত করেছে। এর আগে ইরানের সামরিক বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর বেসামরিক নাগরিকদের বন্দর এলাকা এড়িয়ে চলার সতর্কতা দেয়।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের খার্গ দ্বীপ-এ হামলা চালায়—যেখান দিয়ে প্রায় সব ইরানি তেল রপ্তানি হয়।
তবে উভয় পক্ষই নিশ্চিত করেছে, ওই হামলায় শুধু সামরিক প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেল রপ্তানি টার্মিনাল অক্ষত রয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় এখন পর্যন্ত ১,২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যদিও এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলেছে, ইরানে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের অধিকাংশই রাজধানী ও বড় শহর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে।
পেন্টাগন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বাহিনী এখন পর্যন্ত ইরানে ১৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছে, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে উভচর যুদ্ধ জাহাজ ইউএসস ত্রিপোলি এবং প্রায় ২,৫০০ মেরিন সেনা পাঠিয়েছে।