বাসস
  ০১ মার্চ ২০২৬, ১৫:২৫

যুদ্ধ ও ক্ষমতায় সংজ্ঞায়িত রাশিয়ার ‘চিরস্থায়ী’ নেতা পুতিন

ঢাকা, ১ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : ভ্লাদিমির পুতিনের  পঁচিশ বছরের শাসনকালে চার বছর ধরে ইউক্রেন আক্রমণ চলে। এ সময় তিনি ক্ষমতার লাগাম শক্ত করেছেন। বিরোধীদের দমন করেছেন। রাশিয়ার প্রভাব ও সীমান্ত বিস্তারের চেষ্টা করেছেন।

ওয়ারশ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

যে যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হবে বলে তিনি ভেবেছিলেন, চার বছর পর তা লাখো মৃত্যুর রক্তাক্ত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। সংঘাত যেন পুতিনকেই গ্রাস করেছে।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও দীর্ঘদিনের পুতিন-পর্যবেক্ষক মার্ক গ্যালিওত্তি এএফপিকে বলেন, ‘যুদ্ধ চলুক বা এ বছর শেষ হোক, এটিই তার প্রেসিডেন্সির সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে।’

যুদ্ধের ফল যা-ই হোক না কেন, ইতোমধ্যেই এই যুদ্ধ লাখো মানুষের প্রাণ কেড়েছে, ব্যাপক ধ্বংস ডেকে এনেছে ও দুই দেশকেই চিরতরে বদলে দিয়েছে।  ৭৩ বছর বয়সী রুশ এই নেতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে  এটি।

ক্রেমলিনের এই নেতা আশা করছেন, জয় এলে তিনি রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের পাশেই স্থান পাবেন।

তার কাছে বিষয়টি অস্তিত্বের প্রশ্ন।

ফেব্রুয়ারিতে ক্রেমলিনে রুশ সেনাদের সম্মাননা অনুষ্ঠানে পুতিন বলেন, ‘রাশিয়া তার ভবিষ্যৎ, স্বাধীনতা, সত্য ও ন্যায়ের জন্য লড়ছে।’

তবে পশ্চিমা দেশ ও কিয়েভ এই বক্তব্যকে নাকচ করেছে। তাদের মতে, এটি এক নির্মম ও সাম্রাজ্যবাদী ভূখণ্ড দখলের অভিযান।

যুদ্ধ নিয়ে পুতিনের আপসহীন অবস্থান বিশ্বের বৃহত্তম দেশ পরিচালনায় তার ধরণকেই প্রতিফলিত করে।

২০১৭ সালের এক প্রামাণ্যচিত্রে নিজের দর্শন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি জুডোর প্রতি ভালোবাসার কথা টানেন। 

তিনি বলেন, ‘আপনি নমনীয় হতে পারেন এবং হওয়া উচিত। কখনও কখনও ছাড়ও দেওয়া যায়। তবে তা কেবল বিজয়ের দিকে নিয়ে গেলে।’

পুতিন যুদ্ধটিকে রাশিয়া ও পশ্চিমের মধ্যে সভ্যতার সংগ্রামের একাংশ হিসেবে দেখছেন। 

তিনি ২০২৩ সালে বলেছিলেন, পশ্চিমা বিশ্ববাদী অভিজাতরা (অলিগার্করা) ‘রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও অভ্যুত্থান উস্কে দিচ্ছে, ঘৃণা, রুশভীতি ও আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ ছড়াচ্ছে, পরিবার ও ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ নষ্ট করছে।’

-চেচনিয়া, অলিগার্চ ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা -

১৯৯৯ সালের শেষ দিকে ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুতিনের পছন্দের পথ হলো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া, কোনো চাপের কাছে মাথা নত না করা।

প্রথম লক্ষ্য ছিল চেচনিয়া এবং সেখানে রাশিয়ার বাহিনী সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের কথা কথিত রয়েছে।

যারা মুখ খুলেছেন, তাদের ক্রমেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

২০০৩ সালে মিখাইল খোদোরকভস্কিকে গ্রেফতার করা এবং তার ইয়ুকোস তেল কোম্পানি জব্দ করা এক সতর্কবার্তা ও ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।

২০০০-এর দশকের তেলের উচ্চ মূল্যে রাশিয়ার সমৃদ্ধি বেড়ে গেলে, তিনি নাগরিক স্বাধীনতার ওপর আরও দমনমূলক নিয়ন্ত্রণ চালু করেন।

পুতিনের বিরুদ্ধে যারা মুখ খুলেছেন, তাদেরকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

২০১৫ সালে ক্রেমলিন থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে গুলিবিদ্ধ হন রাজনীতিবিদ বোরিস নেমতসোভ, ডাবল এজেন্ট আলেকজান্ডার লিটভিনেনকো লন্ডনে রেডিও এক্টিভ পোলোনিয়ামের বিষক্রিয়ায় নিহত হন ও বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনি ২০২৪ সালে জেলে মারা যান। এই ঘটনাকে ইউরোপীয় দেশগুলো বিষক্রিয়ার ফল বলে উল্লেখ করে।

এরা সকলেই পুতিনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ভয়ানক পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন।

অবশ্য ক্রেমলিন এ সব মৃত্যুর নির্দেশ বা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

-‘পশ্চিমা গ্লোবালিস্ট এলিট’-

দীর্ঘ সময় পশ্চিমা অংশীদাররা নীরব ছিলেন।

তুলনামূলক সস্তা রুশ জ্বালানি ইউরোপে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে সদ্য গড়ে ওঠা সম্পর্ক ভাঙতে কেউ আগ্রহী ছিল না। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পুতিন নিজেকে মিত্র হিসেবেও উপস্থাপন করেছিলেন।

২০১৪ সালে মস্কোর ক্রিমিয়া সংযুক্তির পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ওই ঘটনার পর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে এবং জি-৮ থেকেও শক্তিশালী দেশটিকে বাদ দেওয়া হয়।

- মানুষকে ‘ব্যবহার’-

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী লেনিনগ্রাদে বর্তমান নাম সেন্ট পিটার্সবার্গে  জন্ম নেন পুতিন। তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরে কেজিবি গোয়েন্দা সংস্থায় যোগ দেন। ১৯৮০-এর দশকে তাকে পূর্ব জার্মানিতে পাঠানো হয়।

সাংবাদিক এম. গেসেন তার জীবনী ‘দ্য ম্যান উইদাউট অ্যা ফেস’-এ তাকে ‘রঙহীন’ কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

গ্যালিওত্তির ভাষায়, তিনি বিশেষ আকর্ষণীয় নন। তবে মানুষকে ‘ব্যবহার’ করার এক বিশেষ দক্ষতা তার রয়েছে।
পুতিনের ব্যক্তিগত জীবন রাশিয়ায় অন্যতম নিষিদ্ধ আলোচ্য বিষয়।