বাসস
  ০১ মার্চ ২০২৬, ১৩:৫০

কাবুলের আকাশে বিস্ফোরণ, পাকিস্তানি বিমানে গুলিবর্ষণ আফগান বাহিনীর

ঢাকা, ১ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের আকাশে রোববার বিকট বিস্ফোরণ ও টানা গুলির শব্দ শোনা গেছে। 

তালেবান সরকার জানিয়েছে, কাবুলের আকাশ সীমায় নতুন করে অনুপ্রবেশ করা পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলোকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেছে আফগান বাহিনী।

কাবুল থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

গত বৃহস্পতিবার সীমান্ত বরাবর আফগানিস্তানের আক্রমণ শুরুর পর থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। 

পাকিস্তানি বাহিনী সীমান্তে পাল্টা হামলা চালানোর পাশাপাশি আকাশ পথেও বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে।

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ রোববার বলেন, ‘কাবুলের আকাশে পাকিস্তানি বিমান লক্ষ্য করে বিমান বিধ্বংসী কামান থেকে গোলা ছোঁড়া হচ্ছে।’

এর আগে, গত শুক্রবার কাবুল ও কান্দাহারসহ আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বোমা বর্ষণের কথা স্বীকার করেছিল পাকিস্তান।

বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু

আফগান কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে, পাকিস্তানের একাধিক হামলায় অনেক সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে ইসলামাবাদ কোনো মন্তব্য করেনি। 

কান্দাহারের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মরত নির্মাণ শ্রমিকরা জানান, রোববার সেখানে দু’টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। নির্মাণাধীন ঐ প্রকল্পের ম্যানেজারের দাবি, এই হামলায় তিন জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

আফগান কর্মকর্তাদের মতে, গত বৃহস্পতিবার থেকে খোস্ত, কুনার ও পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানি হামলায় অন্তত ৩০ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। 

অন্যদিকে, পাকিস্তান দাবি করেছে তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল সশস্ত্র বিদ্রোহীরা। 

তবে দুই পক্ষের হতাহতের দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পাল্টাপাল্টি দাবি ও যুদ্ধ পরিস্থিতি

কাবুল ও সীমান্তের মধ্যবর্তী জালালাবাদ এলাকায় শনিবার যুদ্ধবিমানের শব্দ ও দুটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

আফগান নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করেছে, তারা একটি পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে এবং এর পাইলটকে বন্দি করেছে। 

তবে ইসলামাবাদ এই দাবিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

পাকতিকা ও খোস্ত প্রদেশের বাসিন্দারা জানান, সীমান্ত এলাকায় এখনো প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছে। প্রাণভয়ে অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়েছেন। 

৬৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ রসুল বলেন, ‘বোমাবর্ষণ শুরু হতেই নারী ও শিশুরা যে যেভাবে পেরেছে, বেরিয়ে এসেছে। হুড়োহুড়িতে অনেকের পায়ে জুতো ছিল না, এ সময় অনেকে ঠিকমতো পর্দাও করতে পারেনি।’

কূটনৈতিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান

সংঘাত থামাতে সৌদি আরব ও কাতার মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও এখনো কোনো যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়নি। চীন উভয় পক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছে। 

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘তালেবান হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার পাকিস্তানের আছে।’

ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছে, পাকিস্তানে হামলা চালানো জঙ্গি  গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে আফগানিস্তান। 

তবে তালেবান সরকার তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) বহু হামলার দায় স্বীকার করেছে। 

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে পাকিস্তানে তাদের হামলা বেড়েছে।

এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারই প্রথম পাকিস্তান সরাসরি আফগানিস্তানের সরকারি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে, যা আগে কখনোই করেনি।

উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি জানান, দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি চেকপোস্টে সশস্ত্র হামলা হয়েছে। 

তিনি দাবি করেন, হামলায় এ পর্যন্ত আফগান সেনা ও জঙ্গি গোষ্ঠীসহ প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়েছেন। 

অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আফগানিস্তানের মোট ৩৭টি স্থানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। 

পাকিস্তান তাদের ১২ জন সেনা নিহতের কথা স্বীকার করেছে।

বিপরীতে আফগানিস্তানের উপ-মুখপাত্র ফিতরাত দাবি করেছেন, যুদ্ধে ৮০ জনেরও বেশি পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন এবং তারা পাকিস্তানের ২৭টি সামরিক পোস্ট দখল করেছেন। 

আফগান সরকার তাদের ১৩ জন সেনার মৃত্যুর কথা জানিয়েছে।

কাবুলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত দুই দিনে তারা পাকিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালিয়েছে। 

পর্যবেক্ষকদের মতে, এ সব হামলা ড্রোনের মাধ্যমে চালানো হতে পারে।

গত শুক্রবার পাকিস্তান তালেবান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। 

অন্যদিকে আফগান সরকার এখন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে।