শিরোনাম

ঢাকা, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : সাধারণত রমজানে ইফতারে পরিবারের জন্য আয়োজন করে রান্না করতেন চার সন্তানের জননী রাউজাহ। কিন্তু এবার প্রায় তিন মাস ধরে কমলা রঙের একটি ত্রিপলের তাঁবুতেই কোনোমতে দিন কাটছে তার।
গত বছরের মৌসুমি বৃষ্টির ভয়াবহ বন্যায় সুমাত্রা দ্বীপের গ্রামগুলো তলিয়ে গেলে বাস্তুচ্যুত হন তারা। এখনো প্রায় ২৬ হাজার মানুষ ঘরছাড়া। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আচেহ প্রদেশে সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, সেখানকার পরিবারগুলো প্রশাসনের ধীরগতির ত্রাণ তৎপরতায় ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
অনেকে এখনো অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র বা গাদাগাদি করে বসানো তাঁবুতে থাকছেন। কাদায় ঢেকে থাকা বাড়িতে শিগগিরই ফিরতে পারবেন—এমন আশা তাদের নেই।
কার্ডবোর্ড বিছানো মেঝেতে পাতলা চটের ওপর বসে রাউজাহ চার সন্তানকে নিয়ে সবজি ও চিংড়ি দিয়ে ইফতার করেন। অন্তত শুকনো ও নিরাপদ আছেন—এটাই সান্ত্বনা।
৪২ বছর বয়সী এই নারী, যিনি এক নামেই পরিচিত, বলেন, ‘আমি এখনো আতঙ্ক কাটাতে পারিনি। বৃষ্টি হলেই ভয় পাই। বারবার মনে হয়, বাচ্চাদের কীভাবে বাঁচাব।’
সপ্তাহ গড়াচ্ছে। অনুদান কমছে। ২০০৪ সালের সুনামির পর এটাই আচেহর সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। কতদিন এমন অনিশ্চয়তায় থাকতে হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো জোজোহাদিকুসুমো জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে জরুরি তহবিল ছাড়ের আহ্বান নাকচ করেছেন। আন্তর্জাতিক সহায়তাও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পিডি জয়া জেলায় এখনো তেমন পরিবর্তন নেই। কাদার স্রোতে ঢেকে যাওয়া বাড়িগুলো আগের মতোই পড়ে আছে।
রাউজাহ বলেন, ‘আমার গ্রাম এখনো যেন সেদিনের মতোই আছে। ঘরবাড়ি এখনো কাদায় চাপা পড়ে আছে।’
নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে অস্বাভাবিক তীব্র মৌসুমি বৃষ্টি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আঘাত হানে। ইন্দোনেশিয়ার বনাঞ্চল থেকে শ্রীলংকার পাহাড়ি চা-বাগান পর্যন্ত ভূমিধস ও বন্যা দেখা দেয়।
সুমাত্রার তিনটি প্লাবিত প্রদেশে ১,২০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। জাতীয় দুর্যোগ সংস্থা জানিয়েছে, প্রায় ১৪০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির জন্য নিয়ন্ত্রণহীন বন উজাড়কে আংশিকভাবে দায়ী করেছে কর্তৃপক্ষ। দুর্যোগের পর বেশ কিছু বনজ অনুমতিও বাতিল করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। পুনর্গঠনের ব্যয় ৫১ দশমিক ৮২ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ, অর্থাৎ প্রায় ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
প্রাদেশিক রাজধানী বান্দা আচেহ’র শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো স্থানীয় পার্লামেন্টে বিক্ষোভ করে জাতীয় সম্পদ আরও জোরালোভাবে ব্যবহারের দাবি জানিয়েছে।
২০০৪ সালের ‘বক্সিং ডে’ সুনামিতে শুধু আচেহতেই ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। সে সময় আন্তর্জাতিক সহায়তায় পুনর্গঠন করা হয়েছিল।
সেই দুর্যোগ আচেহর বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ইন্দোনেশিয়া সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত কমাতে ভূমিকা রাখলেও জাকার্তার প্রতি অবিশ্বাস এখনো রয়ে গেছে।
স্থানীয় ইমাম ফাখরি বলেন, ‘সরকারি কর্মসূচি ধীরগতির। সমস্যা কোথায়, তা আমরা জানি না।’
রমজান শুরুর ঠিক আগে সরকার-সমর্থিত একটি সংস্থার সহায়তা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। ধানক্ষেত নষ্ট হওয়ায় অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি সহায়তার ওপর নির্ভর করছি।’
রাউজাহ চেয়েছিলেন অন্তত এখন পর্যন্ত তার সন্তানদের মাথার ওপর ছাদ আর শোবার জন্য একটি গদি থাকবে।
তিনি বলেন, ‘অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র দ্রুত শেষ হোক—এটাই চাই। তাঁবুতে বিশ্রাম নেওয়া যায় না। এত গরম যে ঘুমানো যায় না।’
সুমাত্রায় পুনর্গঠন টাস্কফোর্সের নেতৃত দেওয়া গৃহমন্ত্রী টিটো কার্নাভিয়ান ১৮ ফেব্রুয়ারি আইনপ্রণেতাদের জানান—পরিকল্পিত ১৬ হাজার ৬৮৮টির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৮ হাজার ৩০০টি অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণ হয়েছে।
সরকার যে ১৬ হাজার ৩০০টি বাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার ১০ শতাংশেরও কম এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে।
গত মাসে পিডি জয়া জেলায় ঘনবসতিপূর্ণ একটি অস্থায়ী গুদামঘরে স্থানান্তরিত হন রেনি ও তার কিশোরী মেয়েরা।
৩৭ বছর বয়সী রেনির বাড়ি আংশিকভাবে ভেসে গেছে, তিনি বলেন, ‘এখন অন্তত এমন একটা জায়গা পেয়েছি—এ জন্য কৃতজ্ঞ। কিন্তু অনেক প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি।’
তাদের বলা হয়েছিল একটি ক্যাফেটেরিয়া থাকবে ও দৈনিক ১৫ হাজার রুপিয়াহ (৮৯ সেন্ট) ভাতা দেওয়া হবে। কিন্তু কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেন, ‘যদি দিতে না পারেন, তাহলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আশা দেখাবেন না।’
তিন মাসের সরকারি বিদ্যুৎ ভর্তুকি শেষ হলে কীভাবে খরচ সামলাবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। দীর্ঘমেয়াদে কী করবেন—তাও অনিশ্চিত।
তিনি বলেন, গ্রামগুলো এখনো কাদায় চাপা পড়ে আছে।
ইমাম ফাখরির কাছে এটি আচেহর আরেকটি মিশ্র অনুভূতির রমজান।
তিনি বলেন, ‘এটাই আচেহবাসী হিসেবে আমাদের নিয়তি। আপাতত যা আছে, তা নিয়েই চলতে হবে।’