বাসস
  ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:০৬

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ৪ বছর: বদলে যাওয়া জীবনের গল্প

ঢাকা, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চার পেরিয়ে পাঁচ বছরে গড়িয়েছে। নিহত হয়েছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক লাখ সেনাও। যুদ্ধের আগ্রাসনে ইউক্রেনের লাখো মানুষ ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়ায় যুদ্ধের বিরোধিতা করা অনেকে গ্রেফতারও হয়েছেন। অনেকে আবার দেশ ছেড়েছেন নিপীড়ন এড়াতে।

আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি। রাশিয়ার আগ্রাসনের চার বছর পূর্তিতে চারজন মানুষের জীবনে যুদ্ধের গভীর প্রভাব তুলে ধরেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

— একটি পরিবার ধ্বংস —
কিরার বয়স তখন মাত্র তিন মাস। ২৮ বছরের মা ভ্যালেরিয়া আর ৫৪ বছরের দাদি লিউদমিলা। ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল। ইউক্রেনের ওডেসা শহরে তাদের অ্যাপার্টমেন্টে আঘাত হানে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র। কয়েক সেকেন্ডেই শেষ হয়ে যায় তিন প্রজন্মের জীবন।

কিরার বাবা ইউরি তখন বাজারে ছিলেন। হামলার পরের ভিডিওতে দেখা যায়, স্ত্রীর ও শিশুকন্যার জিনিসপত্র খুঁজতে তিনি ধ্বংসস্তূপে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন তিনি।

আইনজীবী ইউরি পরে পেশা বদলে কৃষ্ণসাগর উপকূলের শহরের একটি জনপ্রিয় ক্যাফেতে বেকার (রুটি কারিগর) হিসেবে কাজ শুরু করেন। এক বছর পর তিনি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর। পূর্বাঞ্চলীয় শহর বাখমুতের কাছে যুদ্ধে প্রাণ হারান হন তিনিও। এটি ছিল দীর্ঘ ফ্রন্টলাইনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এলাকাগুলোর একটি।

এ পরিবারটির গল্প এখন ইউক্রেনীয় বেসামরিক মানুষের ভয়াবহ মূল্য চুকানোর প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ভ্যালেরিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আল্লা কোরোলিওভা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এএফপিকে বলেন, ‘এমন শত শত গল্প আছে পুরো দেশে।’

তিনি বলেন, ‘আমার বন্ধু ছিল সূর্যের আলোর মত। ওডেসা, ইউক্রেনীয় সংস্কৃতি, অপেরা-সব ভালোবাসত। তার হাসি ছিল অসাধারণ। তাকে খুব মনে পড়ে।’

মোবাইলে কিরার একটি ছবিও দেখান তিনি। আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘শিশুটির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময়ই পেলাম না।’

— আবার লড়াইয়ে ফিরতে প্রস্তুত —
ভলোদিমিরের ৩২তম জন্মদিনেই রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে।
চার বছর পরও তিনি সেনাবাহিনীতে ফিরতে অস্থির। যদিও ড্রোন হামলায় হারিয়েছেন এক হাত ও এক পা।

তার ডাকনাম ‘আর্খিপ’। ২০২৪ সালে রাশিয়ার এফপিভি ড্রোন তার ইউনিটের অবস্থানের ওপর আঘাত করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।

এর কয়েক মাস আগে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে তার সঙ্গে প্রথম কথা হয় এএফপি প্রতিনিধির। তখন তিনি জানান, ভালো পাইলট হলে ড্রোন ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায়।

এ বছরের জানুয়ারিতে আবারও তিনি এএফপি সাংবাদিকের মুখোমুখি হন। তখন তিনি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন ঘটনার কথা বলেন। আবার যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও জানান।

আর্খিপ বলেন, ‘আমি শুয়ে ছিলাম। মাথা তুলে যখন পায়ের দিকে তাকালাম, দেখি লোকটা... আমার পা কেটে ফেলছে।’

এক মাসে তার শরীরে মোট ২১টি অস্ত্রোপচার হয়। তিনি বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিন অস্ত্রোপচার হত। শুধু শনিবার ছাড়া। কারণ অনেক চিকিৎসকের সেদিন ছুটি থাকে।’

তার পরনে সামরিক পোশাক নেই এখন। কালো ট্র্যাকস্যুট পরা; কৃত্রিম অঙ্গ লাগানো। পাভলোগ্রাদ শহরের একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট চলাকালে এসব কথা বলেন তিনি। আহত হওয়ার আগে তিনি সেখানে খেলতেন।

পুনরায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছেন আর্খিপ। গত ১৮ মাস ধরে নিচ্ছেন চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।

তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই পরিকল্পনা ছিল, সহযোদ্ধাদের কাছে ফিরব।’

তবে এবার পেছনের সারির দায়িত্বে থাকতে চান। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম, ১৯৯১ সালের সীমান্তে ফিরতে পারব।’ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যখন ক্রিমিয়া ও পূর্বাঞ্চলীয় দোনবাস পুরোপুরি কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সে সময়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

‘কিন্তু এখন সেনাবাহিনীতে থেকে সবকিছু সরাসরি দেখে মনে হয়, ১৯৯১ সালের সীমান্তের মূল্য খুব বেশি হবে।’

— যুদ্ধপন্থী কৌতুকশিল্পীর রুপান্তর —
রাশিয়ার ৫৯ বছর বয়সি কৌতুকশিল্পী আন্দ্রেই বোচারভ। নব্বইয়ের দশকের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অদ্ভুত চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পান। ‘মায়ের আদরের ছেলে’ ধরনের সরল টাইপ চরিত্র ছিল তার।

দীর্ঘদিন আড়ালে ছিলেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর নিজেকে রূপান্তর করেন যুদ্ধপন্থী কণ্ঠে। পশ্চিমাদের ‘অধঃপতন’ নিয়ে সমালোচনা শুরু করে নিজের স্থবির ক্যারিয়ারে নতুন গতি নিয়ে আসেন।

‘বোচারিক’ নামে পরিচিত সাইবেরিয়ার এই শিল্পী রুশ সংস্কৃতির এক সংক্ষিপ্ত সোনালি সময়ের প্রতিনিধি ছিলেন। ‘৩৩ স্কয়ার মিটার’ নামের জনপ্রিয় ধারাবাহিকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পরবর্তী সময়ে একটি ঘিঞ্জি অ্যাপার্টমেন্টের ছোট ঘরে পারিবারিক জীবন কেমন ছিল, তা-ই হাস্যকরভাবে ফুটিয়ে তোলা হতো সেই ধারাবাহিকটিতে।

তার নিষ্পাপ হাসি ও সহজ অভিব্যক্তি লাখো দর্শককে আকৃষ্ট করত।
কিন্তু ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির পর তিনি কট্টর পশ্চিমবিরোধী হয়ে ওঠেন। পরিচিতি পান ক্রেমলিনপন্থী হিসেবে।

পডকাস্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সবসময় ‘মাতৃভূমি ও শেকড়’-এর প্রতি অনুগত থাকার কথা বলেন। তিনি যেমন রুশ অভিযানের বিরোধিতাকারীদের নিন্দা জানাচ্ছেন, তেমনি যারা প্রতিবাদ হিসেবে কিংবা যুদ্ধে যাওয়ার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, সেসব রাশিয়ানদেরও তীব্র ভাষায় বিদ্রুপ করছেন।

রাশিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকের মতই যুদ্ধের আগে ইউরোপ ও পশ্চিমে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার।

এখন তিনি পশ্চিমাদের ‘রাশিয়াবিরোধী’ এজেন্ডা ও অতিরিক্ত উদারনীতির সমালোচনা করেন। ক্রেমলিনের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায় তার কথায়। টেলিগ্রাম ও রাশিয়ার সামাজিক মাধ্যম ভিকে-তে তার অনুসারী প্রায় ৪ লাখ।

রাষ্ট্রীয় বেতার স্পুটনিক-এ সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানও সঞ্চালনা করেন তিনি।
সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা এক নম্বর। কারণ আমাদের আত্মা আছে, শুধু টাকা নয়। সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া আমাদের ছেলেরা প্রতিদিন তা প্রমাণ করছে।’

তিনি প্রায়ই বলেন, ‘রাশিয়া সবসময় জেতে। আমরা রাশিয়ান। আর বোরশ্চ আমাদের সঙ্গে আছে!’ বোরশচ একধরনের উজ্জ্বল লাল বিটের স্যুপ- যা ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয়েই নিজেদের জাতীয় খাবার বলে দাবি করে- সেটির প্রতিই ইঙ্গিত করেন তিনি।

— নীরব বিরোধী —
রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরুর দিনই মস্কোতে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে যান ভারভারা। পরে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক আবেদনে স্বাক্ষর করায় চাকরি হারান।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার হতে পারি- এ কথা প্রিয়জনদের জানিয়েছিলাম। অতিরিক্ত চাবিও রেখে গিয়েছি। ভেবেছি, আমি না থাকলে আমার বিড়াল না খেয়ে মরবে।’

নিরাপত্তার কারণে নাম পরিবর্তন করে বলা হয়েছে তার গল্প। তিনি বড় আকারের বিক্ষোভ দমন অভিযানে ধরা পড়া থেকে রক্ষা পেয়েছেন। পরবর্তী দিনগুলোতে রাশিয়া কঠোর সামরিক সেন্সর আইন পাস করে। এতে তার অনেক বন্ধু দেশ ছেড়ে যান।

তিনি বলেন, ‘আমারও মনে হয়েছিল, হয়তো আমাকে চলে যেতে হবে। কিন্তু কীভাবে, কোথায়, কী দিয়ে বাঁচব- বুঝতে পারিনি।’

মুখোশধারী পুলিশ যেকোনো সময় দরজায় কড়া নাড়তে পারে- সারাক্ষণ এমন একটি আতঙ্কে থাকতেন। তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কিছুই ঘটেনি; বরং একটি অলাভজনক সংস্থায় নতুন চাকরি পেয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, নিজের দেশের চালিয়ে যাওয়া এই যুদ্ধ নিয়ে অপরাধবোধে ভুগতেন তিনি। এসবকিছু ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এবং একটু সুখের দেখা পেতে তার দীর্ঘ দুই বছর সময় লেগেছে।

আগের স্ত্রীর একটি সন্তান রয়েছে-এমন এক পুরুষকে বিয়ে করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি সন্তানের দায়িত্ব নিতে চাই। কিন্তু নিজের এ ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য আর নেই।’

রাশিয়ায় এখনও থাকা অধিকাংশ যুদ্ধবিরোধী মানুষের কাছে নীরব থাকাই কারাগার এড়ানোর একমাত্র পথ।

তবুও যুদ্ধ তার জীবনের সবখানে প্রভাব ফেলেছে। এমনকি বাবা-মেয়ের সম্পর্কেও।
তার বাবা রুশ নিরাপত্তা বাহিনীতে কাজ করেন। ইউক্রেনে যুদ্ধ করেছেন। নিয়মিত আর্থিক সহায়তাও দিতে চান।

তিনি বলেন, ‘তিনি আমার বাবা। আমি তাকে ভালোবাসি। কিন্তু এই টাকা নেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব।’

রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে শাসনব্যবস্থা বদলানো সম্ভব বলে মনে করি না। নিচ থেকে যেকোনো প্রতিরোধ দমন করা হবে। আমি শুধু আশা করি, আমরা অন্তত শারীরিকভাবে বেঁচে থাকতে পারব।’