শিরোনাম

ঢাকা, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : এক দশকেরও বেশি সময় সৌদি আরবে কাজ করার পর রুদ্র বাহাদুর কামি কাঠমান্ডু বিমানবন্দরের পেছনের দরজা দিয়ে দেশে ফিরলেন। তবে জীবিত নন। ক্ষতবিক্ষত একটি কফিনে তার লাশ এসেছে।
দেশে থাকা পরিবারের ভরণপোষণের জন্যই বিদেশে কাজ করতে গিয়েছিলেন রুদ্র বাহাদুর।
কাগজপত্রে সই করতে উপস্থিত ছিলেন তার বড় ছেলে ললিত বিশ্বকর্মা, বয়স ২১।
রুদ্র বাহাদুরের মৃত্যু সনদে লেখা— হার্ট অ্যাটাক। তার বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর।
কাঠমান্ডু থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
ব্যাগেজ কর্মীরা অত্যন্ত অবহেলার সঙ্গে কফিনটি ট্রাকের পেছনে তুললেন হারানো লাগেজের মতোই। এতে কোনো আনুষ্ঠানিকতার সুযোগ নেই। পেছনে সারিতে অপেক্ষায় আরও দুটি লরি।
প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার জন প্রবাসী শ্রমিকের লাশ এভাবেই বিমানবন্দরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রুদ্র প্রতাপের ছেলে বলেন, ‘সন্তান আর পরিবারের সুখের খোঁজে গিয়েছিলেন তিনি। এখন তার লাশ কফিনে ফিরে এলো। এটা সহ্য করা যায় না।’
সরকারি হিসাবে প্রায় ২৫ লাখ নেপালি বিদেশে কাজ করেন, যা মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
এদের অধিকাংশই কাজ করেন উপসাগরীয় দেশ ও সৌদি আরবের নির্মাণক্ষেত্রে, হোটেল ও কারখানায়। অনেকে ভারত ও মালয়েশিয়ায়ও কাজ করেন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যে জানা যায়, তাদের পাঠানো অর্থ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্রতম দেশ নেপালে দীর্ঘদিনের বেকারত্ব তরুণদের বিদেশমুখী করেছে। এ অসন্তোষ থেকেই ‘জেন জি’ বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়, যা গত সেপ্টেম্বরে ৭৩ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকারের পতন ঘটায়।
-ঋণ নিয়ে বিদেশযাত্রা-
চিতওয়ান ন্যাশনাল ঠিক ওপারে, শেষ কিছু বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল, দক্ষিণের মাদি শহরটি নেপালের আদম রফতানির ওপর গভীর নির্ভরতার প্রতীক।
৩৯ বছর বয়সী দীপক মাগার ভাঙাচোরা সড়কের বাঁকে নিজের ছোট বাড়িটি নিয়ে গর্বিত। কংক্রিট ব্লকের ছোট ঘর, ওপরে টিনের ছাউনি।
সৌদি আরবের একটি মার্বেল কারখানায় তিন বছর ঘাম ও শ্রম দিয়েছেন তিনি।
দীপক বলেন, ‘৭ লাখ নেপালি রুপি আয় করেছি। এই বাড়ি বানাতেই সব খরচ হয়ে গেছে।’
চার সন্তানের বাবা দীপর বাড়ির বাইরের দেয়ালে প্লাস্টার শেষ করতে ব্যস্ত।
এরপর পরিবার ও দিগন্তে বরফেঢাকা হিমালয় পেছনে রেখে আবার রিয়াদে কাজে ফিরবেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে পরিবার চালাতে হবে। সন্তানদের পড়াশোনা করাতে হবে।’
দীপক বলেন, ‘পরিবার ছেড়ে যেতে খারাপ লাগে। কিন্তু এখানে কাজ নেই।’
তার এক ভাই সৌদি আরবে আর আরেকজন রোমানিয়ায় কাজ করছে।
৬০ বছর বয়সী বাবা ধনা বাহাদুর মাগার বলেন, ‘সবাইকে খাওয়ানোর মতো জমি আমাদের নেই।’
সড়কের ওপারেও একই গল্প।
জুনা গৌতমের দুই মেয়ে জাপানে কাজ করে।
পড়াশোনা করেও এখানে কাজের সুযোগ না থাকায়, চাকরি যোগাড় করা এজেন্সিগুলোকে টাকা দিতে গিয়ে অনেকেই বড় অঙ্কের ঋণে জড়ান বলে জানান তিনি।
স্থানীয় কাউন্সিলর বীরেন্দ্র বাহাদুর ভান্ডার বলেন, প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জেলায় ১ হাজার ৫০০ জন তরুণ বিদেশে কাজ করছেন।
-শিল্পমাত্রার অভিবাসন-
পরিস্থিতি অন্যত্রও আলাদা নয়। নেপালের খাড়া পাহাড়ি উপত্যকাগুলো তরুণশূন্য হয়ে পড়ছে।
ঊনবিংশ শতকের শেষ দিক থেকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে গুর্খা হিসেবে লড়তে তরুণ নেপালিরা দেশ ছাড়তেন।
তবে ২০০৬ সালে শেষ হওয়া ১০ বছরের মাওবাদী বিদ্রোহের সময় অভিবাসনের স্রোত তীব্র হয়।
নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ক জাতীয় নেটওয়ার্কের নীলাম্বর বাদল বলেন, যুদ্ধ এড়াতে তরুণরা শহরে আশ্রয় নেন। পরে বিদেশে কর্মসংস্থানকেই নিরাপদ পথ হিসেবে দেখেন তারা।
গত এক দশকে কৃষি ও পর্যটন খাত স্থবির হয়ে পড়ায় দেশত্যাগ যেন শিল্পমাত্রা পেয়েছে।
২০১৬ সালে বিদেশে কাজের অনুমতি দেয় সরকারি সংস্থা ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন এমপ্লয়মেন্ট (ডিওএফই)।
অনুমতির সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫১৯।
তবে, গত বছর তা প্রায় তিন গুণে পৌঁছায়।
প্রায় অর্ধেক নেপালি পরিবারই রেমিট্যান্স পাচ্ছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলার বদলে বিদেশি কর্মসংস্থানকে উৎসাহ দেওয়া হয়।