বাসস
  ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪০

পাকিস্তান নির্ভরতা কাটাতে গিয়ে আফগান ওষুধ বাজারে অস্থিরতা

ঢাকা, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ওষুধের মানোন্নয়ন ও দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ওষুধ বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত এই রদবদলে নানামুখী সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

কাবুল থেকে এএফপি জানায়, নভেম্বরে তালেবান কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয়, পাকিস্তান থেকে দীর্ঘদিনের ওষুধ আমদানিনির্ভরতা শিগগিরই বন্ধ করা হবে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। 

চলতি মাসে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল কাইয়ুম নাসির এএফপিকে বলেন, আমদানিকারকদের ‘বিকল্প ও বৈধ’ উৎস খুঁজে নিতে বলা হয়েছে।

তিন মাসের সময়সীমা দেওয়া হলেও যাতে আগের চুক্তি শেষ ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়—এই পরিবর্তন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আফগানিস্তান আগে তার অর্ধেকেরও বেশি ওষুধ পাকিস্তান থেকে আমদানি করত।

কাবুলের এক ফার্মাসিস্ট মুজিবুল্লাহ আফজালি বলেন, ‘কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে, কিছু আবার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না—এতে মানুষের অনেক সমস্যা হচ্ছে।’

এখন ওষুধ অন্য দেশ থেকে আনতে হওয়ায় পরিবহন সময় ও ব্যয় বেড়েছে এবং জটিলতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। 

আফজালি জানান, তিনি এখন ইরান সীমান্তের ইসলাম কালা ক্রসিং দিয়ে ওষুধ আনছেন, এতে পরিবহন ব্যয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে।

নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওষুধশিল্প সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানান, আগে মোট ব্যয়ের ৬-৭ শতাংশ ছিল পরিবহন খরচ, যা এখন বেড়ে ২৫-৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, ব্যবসায়ীদের ইতোমধ্যে মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আগে বাজারে কোনো ওষুধ কম পড়লে পাকিস্তানে ফোন দিলেই দুই-তিন দিনের মধ্যে পৌঁছে যেত—আইনগত হোক বা না হোক, দ্রুত সরবরাহ পাওয়া যেত।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শরাফাত জামান বলেন, পাকিস্তান থেকে আসা নকল ও ভেজাল ওষুধ বড় সমস্যা ছিল, যা বাজার সংস্কারের অন্যতম কারণ। তিনি জানান, ইরান, ভারত, বাংলাদেশ, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, চীন ও বেলারুশের সঙ্গে নতুন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।

তার ভাষায়, ‘ভারত বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল, তাই ভারতীয় ওষুধের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।’

তিনি দাবি করেন, দেশে ৬০০ ধরনের ওষুধ উৎপাদন শুরু হওয়ায় অনেক রোগীর সমস্যা কমেছে।

আফগান প্রতিষ্ঠান মিল্লি শিফা ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিদিন ১ লাখ বোতল অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন সিরাম উৎপাদন করছে বলে জানান কোম্পানির প্রধান নির্বাহী নাসার আহমদ তারাকি। 

চাহিদা বাড়লে উৎপাদন দ্বিগুণ করার সক্ষমতাও রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা, উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও সীমিত অবকাঠামোর কারণে দেশটি এখনো পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে পারবে না।

দেশজুড়ে শিল্প পুনর্গঠনে তিন মাস যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় ওষুধ পাকিস্তানি ওষুধের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যদিও দীর্ঘদিনের ব্যবহারে পাকিস্তানি ওষুধের ওপর ভোক্তাদের আস্থা তৈরি হয়েছে।

এক শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বলেন, অনেকের ধারণা ‘পাকিস্তানি ওষুধ খেলেই আরোগ্য মিলবে’, অন্য দেশের ওষুধে তেমন আস্থা নেই।

চিকিৎসকরাও চাপে রয়েছেন। কাবুলের এক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী জানান, চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন বদলাতে হচ্ছে, বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা সংশোধনে বাড়তি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।

পাকিস্তান-নির্ভরতা কাটানোর এই পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে চিকিৎসা সেবাকে জটিল করে তুলছে এবং রোগীদের চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে সতর্ক করেন তিনি।