বাসস
  ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৫৫

ইরান আলোচনায় আগ্রহী বলে ট্রাম্পের দাবি

ঢাকা, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস) : ইরানের নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনার আগ্রহ জানিয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার তিনি এ কথা বলেন।

দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই প্রতিবাদ আন্দোলনে ইরান উত্তাল হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কবার্তা অনুযায়ী, দমন-পীড়ন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং পরিস্থিতি এখন ‘গণহত্যা’র দিকে যাচ্ছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদ থেকেই শুরু হয়েছিল এই বিক্ষোভ। পরে তা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে চালু থাকা ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়।

কয়েক দিন ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও ইরান থেকে তথ্য আসা অব্যাহত রয়েছে। গত তিন রাতে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বড় বড় বিক্ষোভের চিত্র দেখা গেছে।

নিহতের সংখ্যা বাড়ার খবর ও একটি মর্গের বাইরে স্তূপ করে রাখা মরদেহের ছবি প্রকাশের পর ট্রাম্প বলেন, তেহরান আলোচনায় বসতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।

এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘গতকাল ইরানের নেতারা ফোন করেছিলেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করা হচ্ছে তারা আলোচনা করতে চায়।’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বৈঠকের আগেই আমাদের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান (সিএইচআরআই) জানায়, ইন্টারনেট বন্ধের এই সময়ে পাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে কয়েক শত বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।

নরওয়েভিত্তিক এনজিও ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানায়, তারা অন্তত ১৯২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

আইএইচআর জানায়, ‘অযাচাইকৃত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অন্তত কয়েক শত এবং কিছু সূত্র অনুযায়ী দুই সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে।’

আইএইচআরের হিসাবে, ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রোববার ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তেহরানের দক্ষিণে একটি মর্গের বাইরে সারি সারি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এএফপি ভিডিওটির অবস্থান শনাক্ত করেছে কাহরিজাক এলাকায়। কালো ব্যাগে মোড়ানো মরদেহের পাশে প্রিয়জনকে খুঁজতে থাকা স্বজনদের দেখা গেছে।

তেহরানে এএফপির একজন সাংবাদিক জানান, শহরটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।

বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে মাংসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বহু দোকান বন্ধ। যেগুলো খোলা থাকে, সেগুলোও বিকেল ৪টা বা ৫টার মধ্যে বন্ধ করে দিতে হয়। ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপকভাবে মোতায়েন হয়।

রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভের ভিডিও তুলনামূলক কম দেখা গেছে। তবে তা কতটা ইন্টারনেট বন্ধের কারণে, তা বোঝা যাচ্ছে না।

একটি বহুল প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, তেহরানের পুনাক এলাকায় আবারও বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছেন।

এই আন্দোলন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তার বয়স ৮৬ বছর। জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওই যুদ্ধের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়েছিল।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জ্বলন্ত ভবনের ছবি দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে একটি মসজিদও রয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্যও প্রচার করা হয়েছে।

তবে টানা তিন দিনের ব্যাপক কর্মসূচির পর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে—এমন চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। রোববার মসৃণ যান চলাচলের দৃশ্য সম্প্রচার করা হয়। তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ-সাদেঘ মোতামেদিয়ান টেলিভিশনে বলেন, প্রতিবাদ কমে আসছে।

রোববার ইরান সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর নিহত সদস্যসহ ‘শহীদদের’ স্মরণে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সহিংসতার প্রতিবাদে সোমবার একটি ‘জাতীয় প্রতিরোধ মার্চে’ অংশ নিতে ইরানিদের আহ্বান জানান।

ট্রাম্পের বারবার সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির জবাবে ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। রাষ্ট্রীয় টিভিতে সম্প্রচারিত বক্তব্যে তিনি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও জাহাজকে ‘বৈধ লক্ষ্য’ বলে উল্লেখ করেন।

ক্ষমতাচ্যুত ইরানি শাহর যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছেলে রেজা পাহলভি, সরকারবিরোধী আন্দোলনের অগ্রদূত হয়ে উঠেছেন। তিনি বলেন, দেশে ফিরে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত রয়েছেন।

রোববার ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমি ইতিমধ্যেই সে পরিকল্পনা করছি।’

পরে তিনি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি কর্মীদের বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সামনে দুটি পথ রয়েছে। তারা জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে জাতির মিত্র হতে পারেন, অথবা জনগণের হত্যাকারীদের সহযোগীও হতে পারেন।’

তিনি বিক্ষোভকারীদের ইরানি দূতাবাসগুলোর বাইরে থাকা পতাকা বদলে দেওয়ারও আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘এখন সময় এসেছে সেখানে ইরানের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের।’

বিপ্লব-পূর্ব আনুষ্ঠানিক পতাকাটি বিশ্বজুড়ে ইরানি বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে আয়োজিত সমাবেশগুলোর প্রতীক হয়ে উঠেছে।

লন্ডনে সপ্তাহান্তে বিক্ষোভকারীরা ইরানি দূতাবাসের পতাকা নামিয়ে সেখানে শেষ শাহর আমলের ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করেন।