বাসস
  ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:৫৫

গাজা ও ইরান নিয়ে আলোচনায় ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন নেতানিয়াহু

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ (বাসস): ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সোমবার ফ্লোরিডায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। গাজা যুদ্ধবিরতির নাজুক পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চাপ দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পাম বিচ থেকে এএফপি জানায় এ সময় নেতানিয়াহু ইরান প্রসঙ্গেও আলোচনার কেন্দ্র সরানোর চেষ্টা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে আরও মার্কিন হামলার আহ্বান জানাতে পারেন।

ট্রাম্পের বিলাসবহুল মার-এ-লাগো রিসোর্টে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রে দুই নেতার মধ্যে এটি পঞ্চম বৈঠক। এমন সময়ে এই সাক্ষাৎ হচ্ছে, যখন হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে ইসরাইল ও হামাস—উভয় পক্ষই গড়িমসি করছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুই এই আলোচনার অনুরোধ করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী জানুয়ারির মধ্যেই গাজার জন্য একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক সরকার গঠনের ঘোষণা এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে আগ্রহী ট্রাম্প।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় (গ্রিনিচ মান সময় ১৮০০) বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।

ইসরাইলি সরকারের মুখপাত্র শোশ বেদ্রোসিয়ান জানান, চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনা করবেন নেতানিয়াহু। এই ধাপে ‘হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা’ নিশ্চিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে রওনা হওয়ার আগে বেদ্রোসিয়ান বলেন, নেতানিয়াহু ‘মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্যই ইরান যে হুমকি সৃষ্টি করছে’, সে বিষয়টিও আলোচনায় তুলবেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইলি কর্মকর্তারা ও গণমাধ্যম উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন যে, জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে হামলার মুখে পড়ার পর ইরান আবারও তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠন করছে।

তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির (সিআইপি) গবেষক সিনা তুসি বলেন, জুনে মার্কিন হামলায় তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়েছে, ট্রাম্পের এই জোরালো দাবির ফলে ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ে ইসরাইলের সবচেয়ে শক্তিশালী ঐতিহাসিক যুক্তিটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে’।

তুসি এএফপিকে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে নেতানিয়াহুর নতুন করে জোর দেওয়া আসলে ‘একটি বিকল্প যুদ্ধকারণ তৈরি করার প্রচেষ্টা’।

সোমবার ইরান এসব প্রতিবেদনকে ‘তেহরানের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন’ বলে নিন্দা জানায়। দেশটি জানায়, আত্মরক্ষায় তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং নতুন করে আগ্রাসন চালানো হলে ইসরাইলকে ‘আরও কঠোর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে।

নেতানিয়াহুর এই সফর পাম বিচে কয়েক দিনের টানা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার পরিসমাপ্তি টানছে। এর আগে রোববার ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সেখানে আমন্ত্রণ জানান, রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধের উপায় নিয়ে আলোচনা করতে।

অক্টোবরে হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতি ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরার প্রথম বছরের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে তার প্রশাসন ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা এই অগ্রগতি ধরে রাখতে আগ্রহী।

ট্রাম্পের বৈশ্বিক দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার এ মাসের শুরুতে মিয়ামিতে কাতার, মিসর ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বিষয়ক শান্তি উদ্যোগ ‘অ্যালায়েন্স ফর টু স্টেটস’-এর সহ-প্রধান গার্শন বাসকিন বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের সময়টি ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।

ব্যাক-চ্যানেল আলোচনায় হামাসের সঙ্গে যুক্ত থাকা বাসকিন এএফপিকে বলেন, ‘দ্বিতীয় ধাপ শুরু হতেই হবে।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমার মনে হয়, আমেরিকানরা বুঝতে পারছে—এখন দেরি হয়ে যাচ্ছে, কারণ হামাস তার উপস্থিতি পুনর্গঠনের জন্য অতিরিক্ত সময় পেয়ে গেছে।’

যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামলার সময় নেওয়া অবশিষ্ট জিম্মিদের—জীবিত ও মৃত—মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। হামাস এখন পর্যন্ত জীবিত সব জিম্মিকে এবং একজন ছাড়া বাকি সবার মরদেহ ফিরিয়ে দিয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে ইসরাইলের গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করার কথা রয়েছে, আর হামাসের অস্ত্র সমর্পণের কথা বলা হয়েছে—যা ইসলামপন্থী এই গোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে একটি অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ গাজা শাসন করবে এবং সেখানে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) মোতায়েন করা হবে বলে পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

অ্যাক্সিওস নিউজ আউটলেট শুক্রবার জানায়, জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোস ফোরামে ট্রাম্প গাজার জন্য নতুন ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রথম বৈঠক আহ্বান করতে চান, যার সভাপতিত্ব করবেন তিনি নিজেই।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়, শান্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে নেতানিয়াহু যে চেষ্টা করছেন বলে মনে করা হচ্ছে, তা নিয়ে হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছেন।

লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ‘আমেরিকান প্রশাসন যে নেতানিয়াহু নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে—এর লক্ষণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।’

তিনি যোগ করেন, ‘প্রশ্ন হলো—তারা এ নিয়ে কী করবে, কারণ এই মুহূর্তে দ্বিতীয় ধাপ কার্যত কোথাও এগোচ্ছে না।’

ইসরাইল গাজায় হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, একই সঙ্গে লেবাননে আরেকটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহর ওপরও হামলা চালাচ্ছে। সিরিয়া প্রসঙ্গও আলোচনায় আসবে।

মেকেলবার্গ বলেন, ইসরাইল যখন নির্বাচনী বছরে প্রবেশ করছে, তখন নেতানিয়াহু গাজা থেকে মনোযোগ সরিয়ে ইরানের দিকে নিতে চাইছেন।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা এই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সবকিছুই ক্ষমতায় টিকে থাকার সঙ্গে যুক্ত।’