শিরোনাম

নুসরাত সুপ্তি
নারায়ণগঞ্জ, ৮ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার সুইপার কলোনি। ঘিঞ্জি পরিবেশ আর বঞ্চনার প্রথাগত আখ্যান যেখানে পরতে পরতে মিশে আছে। অবহেলার প্রতীক হয়ে থাকা এই জনপদে এখন বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। যে সমাজ একসময় মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়াকে ‘বিলাসিতা’ মনে করত, সেই সমাজেরই ১১ জন নারী এখন পরিবর্তনের কাণ্ডারি। তাঁদের লক্ষ্য একটাই—দলিত সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে যাত্রা।
এই অদম্য যাত্রার কেন্দ্রে রয়েছেন সনু রানী দাস। এই কলোনিরই গলিপথ থেকে উঠে আসা এক লড়াকু নাম। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘দলিত নারী উন্নয়ন সংস্থা’ এখন পুরো কলোনির জন্য এক আশার প্রদীপ। সনুর সঙ্গে আছেন আরও ১০ জন স্বপ্নবাজ নারী।
সম্প্রতি সনু রানী ও তার সংগঠনের নারীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায় তাদের জীবন সংগ্রাম ও প্রেরণার ফুল হয়ে উঠার গল্প।
নিজের ইচ্ছাশক্তি ও মনোবলেই সমাজের বাধা ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে পারা যায় এবং নারী-পুরুষ কিংবা যেকোন বৈষম্যের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে কথা বললে অধিকার আদায় করা সম্ভব বলে মনে করেন সনু রানী (৩৫)।
সনু রানী দাসের শুরুর গল্পটা ছিল শিক্ষক হওয়ার। জেলার দলিত সম্প্রদায়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন তিনি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পরীক্ষা দিয়েছেন বারবার, কিন্তু সাফল্য আসেনি। সেই আক্ষেপ থেকে জন্ম নেয় এক নতুন সংকল্প।
সনু বলেন, আমি শিক্ষক হতে পারিনি তো কী হয়েছে? আমি সেই ঢাল হবো, যা আমার মতো অন্যদের স্বপ্নপূরণে সহায়তা করবে।
২০২৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ‘জয়িতা’র সম্মাননা পাওয়া সনু এখন তাঁর সংগঠনের মাধ্যমে তার সম্প্রদায়ের নারীদের ঘরের গণ্ডি থেকে বের করে আনছেন। সনু বলেন, সুইপার কলোনির নারীরা তাদের অধিকার ও ঘরের বাইরের বাস্তব জীবন নিয়ে সচেতন নয়। তারা ছেলে শিশুকে স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হলেও মেয়ে শিশুদের পাঠাতে চায় না। তাদের এই গণ্ডি থেকে বের করে এনে জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া টাই ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, এক সময় আমি একা হলেও আজ আমার সহায়তায় আছে আরো দশজন নারী। যারা সবাই এই কলোনির নারী। আমরা নারীদের অধিকার ও শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। আমরা চাই আমাদের কলোনির ছেলে মেয়েদের কেউ অবহেলা না করুক, তারাও সমাজের সম্পদে পরিণত হবে।
সুইপার কলোনির প্রধান সমস্যা, ভাষাগত। তাঁদের মাতৃভাষা হিন্দি হওয়ায় শিশুরা স্কুলে গিয়ে বাংলা পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। ফলে প্রাথমিকেই ঝরে পড়ার হার বেশি। সনু রানী বলেন, আমাদের নারীরা হিন্দি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হওয়ায় বাইরের মানুষের সঙ্গে মিশতে ভয় পায়। আমি চাই তাদের ভাষাগত বাধা দূর করতে, যেন তারা বুক ফুলিয়ে নিজের অধিকারের কথা বলতে পারে।
সনুর এই লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন কলোনির বিভিন্ন বয়সের নারীরা। ‘দলিত নারী উন্নয়ন সংস্থা’র সদস্য স্নেহা রানী দাস উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন। শিগগির তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি এই কলেনির শিশুদের পড়ান। তিনি বলেন, সনু দিদি আমাদের আদর্শ। তাঁকে দেখে আমরা সাহস পেয়েছি পরিবারকে বলতে যে আমরাও পড়াশোনা করতে চাই। আজকে আমি সনু দিদির মতো আমার কলোনির শিশুদের পড়াই, দিদির সঙ্গে আমার কলোনির উন্নয়নে কাজ করছি।
এই কলোনির আরেক প্রেরণা, পূজা রানী দাস। তিনি তাদের সংগঠনের ক্যাশিয়ার। একইসঙ্গে সফল উদ্যোক্তা। তিনি পোশাক তৈরির পাশাপাশি কেক বানিয়ে বিক্রি করেন।
একই কলোনির চঞ্চলতা ও সাহসিকতার দৃষ্টান্ত দিপা রানী দাস। মাত্র পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়লেও দমে যাননি। তিনি এখন চমৎকার সাইক্লিং করেন এবং কলোনির শিশুদেরও সাইকেল চালানো শেখান। তাঁর হাত ধরে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, যে কলোনিতে নারীদের ঘরে আবদ্ধ হয়ে থাকা শেখানো হয়, সেখানে সাইকেলিং করাটা দৃষ্টিকটু। কিন্তু এখন আমি শেখার পর অনেক শিশুদের শিখিয়েছি। কলোনির মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হচ্ছে।
দলিত নারী উন্নয়ন সংস্থা থেকে এই কলেনির নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন সভা করেন সনু। এছাড়াও তাদের শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি গান, ছবি আঁকা, সাইকেলিংসহ নানা ভিন্নধর্মী কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন।
শিগগির একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ফান্ড পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানান সনু, যা তাঁদের কাজের পরিধি আরও বাড়িয়ে দেবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয় মহিলা সংস্থার কর্মকর্তা ফারজানা কিবরিয়া এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, সনু রানী ও তাঁর সংগঠনের এই অগ্রযাত্রা প্রশংসনীয়। তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিতে সংস্থাটি সব সময় পাশে থাকবে।
সুইপার কলোনির প্রতিটি পরিবারের ঘরে এখন শিক্ষার আলাপ হয়। একসময়ের সেই সরু গলিগুলোতে এখন আর শুধু ময়লা ও পরিষ্কারের গন্ধ নেই, সেখানে এখন মিশে আছে স্নেহা, পূজা আর দিপাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ঘ্রাণ। তারা স্বপ্ন দেখে, এমন এক দিন আসবে যখন ‘দলিত’ পরিচয় কাউকে হেয় করবে না, বরং তাদের মেধা ও শ্রমই হবে তাদের আসল পরিচয়।