বাসস
  ২৫ জুলাই ২০২৬, ২২:১৯

আইসিইউতে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তাগিদ

ছবিঃ আইসিডিডিআর,বি

ঢাকা, ২৫ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট) ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বেশি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। 

সংস্থাটির সাম্প্রতিক দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় এ ধরনের ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা রোগীদের অর্ধেকেরও বেশি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সংক্রমিত হয়েছেন। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহারও ছিল অত্যন্ত বেশি।

গবেষকরা বলেছেন, হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল-আইপিসি) ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং এ-সংক্রান্ত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা দুটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল -এ প্রকাশিত হয়েছে।

ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগী এবং একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৩৬৩ জন নবজাতকের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণা দুটি পরিচালিত হয়।

গবেষণার প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআর,বি-এর সহকারী বিজ্ঞানী ড. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন বলেন, রোগীদের পুরো চিকিৎসাকাল পর্যবেক্ষণ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং হোল-জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে কীভাবে হাসপাতালের ভেতরে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং কীভাবে শরীরে নীরবে বহন করা জীবাণু পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সংক্রমণে রূপ নেয়, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণাটি মূলত চিকিৎসাকঠিন গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার ওপর আলোকপাত করেছে। এসব ব্যাকটেরিয়া বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হওয়ায় নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মূত্রনালির সংক্রমণ এবং ক্ষত সংক্রমণের মতো গুরুতর রোগের চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে।

গবেষণায় চারটি প্রধান গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া - এশেরিশিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ে ও অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি এবং সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা-পরীক্ষা করা হয়।

ফলাফলে দেখা গেছে, আইসিইউর ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ রোগীর অন্ত্রে চিকিৎসাকঠিন গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। এছাড়া ভর্তি হওয়ার সময় এ ধরনের ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা ১৯৮ জন রোগীর মধ্যে ১০৫ জন, অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সংক্রমিত হন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, যেসব রোগীর ক্ষেত্রে কালচার পরীক্ষায় এই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

গবেষকদের মতে, সীমিত আইসিইউ সুবিধা, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং হাসপাতাল-সম্পর্কিত সংক্রমণের (নোসোকোমিয়াল ইনফেকশন) ঝুঁকি এই উচ্চ মৃত্যুহারের অন্যতম কারণ হতে পারে।

তবে, দ্বিতীয় গবেষণায় ইতিবাচক ফলও উঠে এসেছে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ঢাকার একটি এনআইসিইউতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা অনুযায়ী সংক্রমণ প্রতিরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পর সাত মাসে প্রতি ১০০ জন ভর্তি রোগীর মধ্যে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ ২৮ জন থেকে কমে ৪ জনে নেমে আসে, যা ৮৬ শতাংশ হ্রাস। একই সময়ে প্রতি ১০০ জন ভর্তি রোগীর মৃত্যুও ২৬ জন থেকে কমে ৪ জনে নেমে আসে।

আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, গবেষণা দুটি দেশের হাসপাতালগুলোতে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি এটিও প্রমাণ করেছে যে, কার্যকর সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

গবেষকরা বলেছেন, হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখা, অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার এবং নিয়মিত সংক্রমণ পর্যবেক্ষণের মতো ব্যবস্থা জোরদার করলেই ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তাঁদের মতে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সুরক্ষায় সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন।