বাসস
  ২২ মে ২০২৬, ১৭:০১

সুস্থ জাতি গঠনে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিরাপদ মাতৃত্ব 

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ২২ মে, ২০২৬ (বাসস) : সুস্থ জাতি গঠনে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে সর্বাগ্রে বাল্য বিবাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। 

কুড়িগ্রাম জেলার রাজাপুর উপজেলার ছোট একটি গ্রাম রাধুনিবাড়ি। এ গ্রামেই বাস করেন ১৮ বছর বয়সি আসমা। স্বামী সুজন মিয়া অন্যের জমিতে কৃষি কাজ করেন। যেদিন কৃষি কাজ থাকে না, সেদিন রিকশা চালিয়ে সংসারের খরচ মিটিয়ে থাকে সে। দুই বছর আগে সুজন মিয়ার সাথে আসমার বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছরের মাথায় তাদের একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আসমা আবারও সন্তান সম্ভবা। পরিবারের সকলের চাওয়া এবার একটি পুত্র সন্তান। 

কিন্তু আবারও কন্যা সন্তান হলো আসমার। বাড়ির সবারই মন খারাপ। যতই দিন যাচ্ছে আসমার প্রতি সবার অবহেলার মাত্রা বেড়েই যাচ্ছে। অপুষ্টি আর অযতেœ আসমার শারীরিক অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে লাগলো। এক সময় আসমার প্রসব পরবর্তী জটিলতা দেখা দেয়। আসমার স্বামী তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয়। কিন্তু অবহেলা আর অনাদরে আস্তে আস্তে নিঃশেষ হয়ে যায় আসমা। মা হারা হয়ে পড়ে অবুঝ দুটি শিশু।

বাল্যবিবাহ আমাদের সমাজে আইনত নিষিদ্ধ হলেও এখন পর্যন্ত গ্রামগঞ্জে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিয়ের বছর পার হতে না হতেই তারা গর্ভবতীও হয়ে পড়ছে। তারপর সে যখন মা হতে যায়, তখন তার সংকট দেখা দেয় চারদিক থেকে। এই সব প্রত্যন্ত এলাকার জনগণ সরকারের অনেক সুযোগ সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়।  

নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে বাল্যবিবাহ রোধ। আমাদের দেশের অনেক চর অঞ্চল এবং দুর্গম এলাকা আছে যেখানে বাল্যবিবাহের প্রবণতা অনেক বেশী। তাই সেখানে শিশু ও মায়েদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে হয়। বাল্যবিবাহের শিকার এক নারী তিন-তিনবার সন্তান ধারণ করলেও একটি শিশুকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। প্রতিটি পিতামাতার উচিত তার মেয়ে সন্তানকে ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে না দেওয়া। কারণ এর আগে মেয়েদের জননতন্ত্র পুর্ণতা পায় না। নারী হিসেবে সংসার পরিচালনার মানসিকতা গড়ে ওঠে না। এছাড়া প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কেও সে থাকে অজ্ঞ।

মা ও শিশুমৃত্যুর হার রোধে বাংলাদেশ অনেকাংশে সফল হয়েছে। অনেক জেলা ও উপজেলা স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবে সুনাম অর্জন করছে। তারপরেও কিছু কিছু জেলায় মা ও শিশুমৃত্যুর হার এখনো বেশী। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে প্রতি লাখ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৫৬ জন প্রসূতি মারা গেছেন। প্রতি হাজার শিশুর জন্মের বিপরীতে ২৫ জন শিশু (নবজাতকসহ) এক বছর হওয়ার আগেই মারা গেছে। 

কুড়িগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতি লাখে ৪২০ জন মা এবং প্রতি হাজারে ৩৮ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রতি লাখে ১৬৮ জন মা এবং প্রতি হাজরে ১৫ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।

গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতের কাছে মাতৃস্বাস্থ্য সুবিধা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। শহরের বস্তি এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চর, হাওর-বাঁওড় ও পার্ব্বত্য এলাকায় নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্বুদ্ধকরণ ও সেবা কার্যক্রম। 

২৮ মে দেশব্যাপী ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে। দিবসটিতে-মানসম্মত গর্ভকালীন সেবা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং নারীর স্বাস্থ্য অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
 
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে সাফল্য এলেও এখনো অনেক সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসকদের বিপরীতে নার্সের সংখ্যা অনেক কম। প্রয়োজনের তুলনায় প্রশিক্ষিত ধাত্রীর সংখ্যাও কম। কিন্তু মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমাতে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য। একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নার্স-ধাত্রী তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কর্মপরিবেশ জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
 
প্রসবকালীন যতœ ছাড়াও প্রসব পরবর্তী জরুরি কিছু যত্ন আছে, যা প্রসূতি মা ও সন্তানের সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন। যেমন-মাকে সর্বদা পরিষ্কার রাখা, মায়ের জন্য পর্যাপ্ত সুষম খাবার, বিশ্রাম ও যত্নের ব্যবস্থা করা। শিশুর নাভির যত্ন, শিশুর টিকা ও শিশুর খাবার হিসাবে মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। ইসলামে প্রসূতি ও নবজাতকের জীবন রক্ষার জন্য জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। শিক্ষার অভাব ও গোঁড়ামির কারণে গ্রামাঞ্চলে মেয়েরা প্রতিবছর সন্তান ধারণ করে থাকেন। এ কারণে শিশুর সঠিক পরিচর্যা না হওয়ায় পুষ্টিহীন ও রোগাক্রান্ত মা ও শিশুর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 
মা ও শিশুর মৃত্যুহার রোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। ভূমিকা রাখতে হবে স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা ও জনপ্রতিনিধিদেরও। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করে প্রসুতিকে সুস্থ রাখতে পারলে নবজাতকেরা সুস্থ থাকবে এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ জাতি।